ক্লোরোপ্লাস্ট (Chloroplast)

ক্লোরোপ্লাস্ট (Chloroplast)


ক্লোরোপ্লাস্ট (Chloroplast) হলো উদ্ভিদ এবং শৈবাল (Algae) কোষের সাইটোপ্লাজমে উপস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গাণু। এটি মূলত প্লাস্টিডের একটি রূপ, যার প্রধান কাজ হলো সূর্যালোক ব্যবহার করে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের খাদ্য (শর্করা বা Glucose) তৈরি করা।

ক্লোরোপ্লাস্টের ভেতরে ক্লোরোফিল (Chlorophyll) নামক সবুজ রঞ্জক পদার্থ থাকে, যার কারণে উদ্ভিদের পাতা ও কচি কাণ্ডের রঙ সবুজ দেখায়। একে উদ্ভিদের "খাদ্য তৈরির কারখানা" বা "রান্নাঘর" বলা হয়।

ক্লোরোপ্লাস্টের গঠন (Structure of Chloroplast)

একটি আদর্শ ক্লোরোপ্লাস্টের প্রধান অংশগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:









আবরণী ঝিল্লি (Double Membrane)

ক্লোরোপ্লাস্ট দুটি স্তরবিশিষ্ট মসৃণ ঝিল্লি বা পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকে—বাইরের স্তরটিকে বহিঃপর্দা (Outer membrane) এবং ভেতরের স্তরটিকে অন্তঃপর্দা (Inner membrane) বলে। এই দুই পর্দার মাঝখানের অংশকে আন্তঃঝিল্লি স্থান বলা হয়।

স্ট্রোমা বা ম্যাট্রিক্স (Stroma)

অন্তঃপর্দা দিয়ে ঘেরা ভেতরের তরল বা আঠালো অংশটিকে স্ট্রোমা বলে। এতে বিভিন্ন ধরনের এনজাইম (উৎসেচক), ডিএনএ (DNA), আরএনএ (RNA) এবং রাইবোজোম থাকে। সালোকসংশ্লেষের আলোক-নিরপেক্ষ পর্যায় বা অন্ধকার পর্যায় (Calvin Cycle) এই স্ট্রোমাতেই ঘটে।

থাইলাকয়েড ও গ্রানাম (Thylakoid and Granum)

স্ট্রোমার মধ্যে চ্যাপ্টা থলির মতো কিছু গঠন একটার ওপর আরেকটা সজ্জিত হয়ে স্তূপ বা চাক্তির মতো অংশ তৈরি করে।

  • প্রতিটি চ্যাপ্টা থলিকে থাইলাকয়েড (Thylakoid) বলে। এই থাইলাকয়েডের ভেতরেই ক্লোরোফিল থাকে।
  • থাইলাকয়েডের এই স্তূপকে একসাথে গ্রানাম (Granum) বলা হয় (বহুবচনে গ্রানা)। সালোকসংশ্লেষের আলোক-নির্ভর পর্যায়টি এই গ্রানাম অংশেই ঘটে।

স্ট্রোমা ল্যামেলি (Stroma Lamellae)

দুটি গ্রানামকে পরস্পরের সাথে যুক্তকারী নলাকার অংশকে স্ট্রোমা ল্যামেলি বলা হয়।

স্বয়ংসম্পূর্ণতা (Semi-autonomous nature)

ক্লোরোপ্লাস্টের নিজস্ব বৃত্তাকার ডিএনএ (cpDNA) এবং ৭0S রাইবোজোম থাকে। এর ফলে এরা নিজেরা নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে এবং নিজস্ব কিছু প্রোটিন সংশ্লেষণ করতে পারে।

ক্লোরোপ্লাস্টের প্রধান কাজসমূহ

সালোকসংশ্লেষ (Photosynthesis): ক্লোরোপ্লাস্টের প্রধান কাজ হলো সৌরশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে উদ্ভিদের জন্য গ্লুকোজ বা শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি করা।

অক্সিজেন উৎপাদন: সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার উপজাত (By-product) হিসেবে এটি বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন (O2) ত্যাগ করে, যা জীবকুলের শ্বাসকার্যের জন্য অপরিহার্য।

ফটোরেস্পিরেশন (Photorespiration): বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্লোরোপ্লাস্ট উদ্ভিদের আলোক-শ্বসন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।

ফ্যাটি অ্যাসিড সংশ্লেষণ: উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড এবং লিপিড তৈরিতেও ক্লোরোপ্লাস্ট ভূমিকা রাখে।

একটি মজার তথ্য (Endosymbiotic Theory)

বিজ্ঞানীদের মতে, কোটি কোটি বছর আগে ক্লোরোপ্লাস্ট আসলে একটি স্বাধীন সালোকসংশ্লেষণকারী ব্যাকটিরিয়া (যেমন: সায়ানোব্যাকটেরিয়া) ছিল। কোনো প্রাচীন ইউক্যারিওটিক কোষ এটিকে গিলে ফেলার পর, তারা একে অপরের সাথে সহাবস্থান (Symbiosis) শুরু করে এবং বিবর্তনের ধারায় এটি কোষের একটি স্থায়ী অঙ্গাণুতে পরিণত হয়। এই ধারণাকে অন্তঃমিথোজীবী তত্ত্ব (Endosymbiotic Theory) বলা হয়।

Share:

Popular Posts

Total Pageviews