পরফাইরিন রিং (Porphyrin Ring)

পরফাইরিন রিং (Porphyrin Ring)

আণবিক জীববিজ্ঞান ও রসায়ন প্রবন্ধ

পরফাইরিনরিং (Porphyrin Ring) হলো চারটি পাইরোল (Pyrrole) রিং পরস্পরের সাথে 4টি মিথিন (–CH=) সেতুর মাধ্যমে যুক্ত হয়ে গঠিত একটি বৃহৎ সমতল (Planar) অ্যারোম্যাটিক ম্যাক্রোসাইক্লিক (Macrocyclic) যৌগ।

গঠনশৈলী

রসায়নের দৃষ্টিতে পরফাইরিন রিংয়ের গঠনটি বেশ চমৎকার:

  • পরফাইরিনরিং (Porphyrin Ring) 4 টি পাইরোল রিং (Pyrrole ring) নিয়ে গঠিত। প্রতিটি পাইরোল রিংয়ে 4টি কার্বন এবং 1টি নাইট্রোজেন পরমাণু থাকে।
  • চারটি পাইরোল রিং মিথাইন ব্রিজ বা কার্বন লিংকের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে একটি বড় বৃত্তাকার বলয় তৈরি করে।
  • রিংটির ভেতরের দিকে মুখ করে থাকা চারটি নাইট্রোজেন পরমাণু একটি চমৎকার কেন্দ্র বা 'পকেট' তৈরি করে, যেখানে যেকোনো উপযুক্ত ধাতব আয়ন এসে বসতে পারে।

পরফাইরিনরিংয়ে এর ভূমিকা

পরফাইরিনবলয়ের সামগ্রিক স্থায়িত্ব এবং কার্যকারিতার পেছনে এই মিথাইন ব্রিজের ভূমিকা অনস্বীকার্য:

  • সেতু বা লিংকার হিসেবে কাজ: পরফাইরিন বলয়ে যে 4টি পাইরোল রিং (Pyrrole rings) থাকে, তারা সরাসরি একে অপরের সাথে যুক্ত হতে পারে না। এই 4টি রিংকে 4টি মিথাইন ব্রিজ বা কার্বন পরমাণু জোড়া দিয়ে একটি বড় বৃত্তাকার কাঠামো বা ম্যাক্রোসাইকেল (macrocycle) তৈরি করে।
  • কনজুগেটেড সিস্টেম তৈরি: জৈব রসায়নে কনজুগেটেড সিস্টেম (Conjugated System) বলতে এমন একটি আণবিক গঠনকে বোঝায়, যেখানে একক বন্ধন (Single bond) এবং দ্বিবন্ধন (Double bond) পরপর একান্তর বা অল্টারনেট (Alternate) অবস্থায় থাকে। মিথাইন ব্রিজের কারণে পুরো পরফাইরিন রিং জুড়ে একান্তর দ্বিবন্ধন (conjugated double bonds) বা পাই-ইলেক্ট্রনের একটি মুক্ত মেঘ তৈরি হয়। রসায়নের ভাষায় একে বলা হয় অ্যারোমেটিসিটি (Aromaticity)। সাধারণ দ্বিবন্ধনে ইলেক্ট্রনগুলো নির্দিষ্ট দুটি কার্বনের মাঝে আটকে থাকে। কিন্তু কনজুগেটেড সিস্টেমে দ্বিবন্ধনের পাই ইলেক্ট্রনগুলো কোনো নির্দিষ্ট পরমাণুর মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো রিং জুড়ে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে। একে বলা হয় ইলেক্ট্রনের ডিলোকলাইজেশন বা রেজোন্যান্স।
  • আলো শোষণ ক্ষমতা: কনজুগেটেড সিস্টেমে ডিলোকলাইজেশন যত বাড়ে, ইলেক্ট্রনগুলোর সর্বোচ্চ পূর্ণ শক্তিস্তর এবং সর্বনিম্ন খালি শক্তিস্তরের মধ্যবর্তী শক্তির ব্যবধান তত কমে যায়। শক্তির এই ব্যবধান যত কম হবে, ইলেক্ট্রনকে নিম্ন শক্তিস্তর থেকে উচ্চ শক্তিস্তরে লাফ দিতে (Excitation) তত কম শক্তির আলোর প্রয়োজন হবে। পরফাইরিন রিংয়ের বিশাল কনজুগেটেড সিস্টেমের কারণে শক্তির ব্যবধান ঠিক ততটুকুই কমে, যতটুকু শক্তি আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান আলোতে (Visible Light - তরঙ্গদৈর্ঘ্য 400 থেকে 700 ন্যানোমিটার) থাকে। যেহেতু দৃশ্যমান আলোর ফোটন কণার শক্তি এই ইলেক্ট্রনগুলোকে উত্তেজিত করার জন্য একদম নিখুঁত, তাই ক্লোরোফিল বা হিমোগ্লোবিনের সংস্পর্শে আলো আসামাত্রই অণুগুলো তীব্রভাবে সেই আলো শোষণ করে নেয়।

এই কনজুগেটেড সিস্টেমের কারণেই হিমোগ্লোবিন বা ক্লোরোফিল অণুগুলো তীব্রভাবে আলো শোষণ করতে পারে ।

একটি জরুরি জৈবিক রূপান্তর

আমাদের শরীরে যখন পুরনো লোহিত কণিকা ভেঙে যায়, তখন লিভারে এই হিমোগ্লোবিনের পরফাইরিন রিংটি ভেঙে ফেলার প্রয়োজন হয়। এনজাইমের উপস্থিতিতে পরফাইরিন রিংয়ের ঠিক একটি মিথাইন ব্রিজ ভেঙে ফেলা হয়। বৃত্তাকার রিংটি তখন একটি খোলা বা সরল রৈখিক চেইনে পরিণত হয়, যাকে আমরা বিলিরুবিন (Bilirubin) ও বিলিভার্ডিন (Biliverdin) নামে চিনি। (রক্তে এই বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলেই জন্ডিস রোগ হয়)।

Share:

Popular Posts

Total Pageviews