ফ্যাটি অ্যাসিড

 

ফ্যাটি অ্যাসিড হলো লিপিড বা চর্বির সবচেয়ে মৌলিক একক। যেমন অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে প্রোটিন তৈরি হয়, তেমনি ফ্যাটি অ্যাসিড দিয়ে লিপিড তৈরি হয়। এটি একটি দীর্ঘ কার্বন শৃঙ্খল এবং এর এক প্রান্তে একটি কার্বক্সিল গ্রুপ (-COOH) যুক্ত থাকে। এটি জলে অদ্রবণীয় কিন্তু জৈব দ্রাবকে (যেমন ইথার, অ্যালকোহল, বেনজিন, ক্লোরোফর্ম, অ্যাসিটোন) দ্রবণীয়।

1. ফ্যাটি অ্যাসিডের গঠন (Structure)

একটি আদর্শ ফ্যাটি অ্যাসিড অণুর দুটি অংশ থাকে: হাইড্রোকার্বন চেইন ও কার্বক্সিল গ্রুপ

A.    হাইড্রোকার্বন চেইন: এটি কার্বন এবং হাইড্রোজেন পরমাণু দিয়ে তৈরি একটি লম্বা শৃঙ্খল। প্রতিটি কার্বন পরমাণু তার পাশের কার্বনের সাথে যুক্ত থাকে এবং বাকি যোজ্যতা পূরণ করে হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে যুক্ত হয়ে।

     CH3-(CH2)n-  এখানে n হলো কার্বন পরমাণুর সংখ্যা (সাধারণত 4 থেকে 36 পর্যন্ত হতে পারে এবং জোড় সংখ্যা হয় )

হাইড্রোকার্বন চেইন জলবিদ্বেষী (Hydrophobic) হয় কেন?

 হাইড্রোকার্বন চেইনগুলো নন-পোলার (Non-polar) হয়। এর ফলে তারা জলের সাথে মিশতে পারে না এবং জলকে বিকর্ষণ করে। এই কারণেই তেল বা চর্বি জলে ভাসতে থাকে কিন্তু মেশে না। কোষের পর্দা (Cell Membrane) তৈরিতে এই বৈশিষ্ট্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কার্বোহাইড্রেটের তুলনায় ফ্যাট থেকে আমরা অনেক বেশি শক্তি পাই কেন?

হাইড্রোকার্বন চেইনে কার্বন-হাইড্রোজেন বন্ধনের সংখ্যা অনেক বেশি থাকে। যখন শরীর এই বন্ধনগুলো ভাঙে, তখন প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক শক্তি নির্গত হয়। একারণেই কার্বোহাইড্রেটের তুলনায় ফ্যাট থেকে আমরা অনেক বেশি শক্তি পাই।

হাইড্রোকার্বন চেইন হলো ফ্যাটি অ্যাসিডের সেই 'জ্বালানি দণ্ড' যা আমাদের শরীরে শক্তি ধরে রাখে এবং জল থেকে কোষকে রক্ষা করে।

হাইড্রোকার্বন চেইনের বৈশিষ্ট্য

  • এটি nonpolar (অধ্রুব)
  • জলকে অপছন্দ করে hydrophobic
  • যত বড় চেইন, তত বেশি শক্তি সঞ্চয় করতে পারে
  • কোষঝিল্লির ভিতরে (lipid bilayer) এই অংশ ভিতরের দিকে থাকে

B.     কার্বক্সিল গ্রুপ: এটি শৃঙ্খলের এক প্রান্তে থাকে (-COOH) যা অ্যাসিডিক বৈশিষ্ট্য প্রদান করে।


একটি ফ্যাট অ্যাসিড সাধারণত এভাব লেখা হয়:

CH₃ – (CH₂) COOH

·         CH₃মিথাইল প্রান্ত (tail)

·         (CH₂)হাইড্রোকার্বন চেইন

·         COOHকার্বক্সিল গ্রুপ (head)


ফ্যাটি অ্যাসিড জলে কেন দ্রবীভূত হয় না?

ফ্যাটি অ্যাসিডের গঠনে একটি দীর্ঘ হাইড্রোকার্বন চেইন থাকে যা সম্পূর্ণ জলবিদ্বেষী বা হাইড্রোফোবিক (Hydrophobic)। যদিও এর এক প্রান্তে একটি ছোট কার্বক্সিল গ্রুপ (-COOH) থাকে যা জলের সাথে কিছুটা আকর্ষণ অনুভব করে, কিন্তু দীর্ঘ হাইড্রোকার্বন লেজের তুলনায় তা খুবই নগণ্য। ফলে পুরো অণুটি জলের সংস্পর্শে এলে জলের অণু থেকে দূরে সরে যায় এবং জলের উপরে তেলের আস্তরণ বা ছোট দানা (Micelles) তৈরি করে।

Note: ফ্যাটি অ্যাসিডের কার্বন চেইন যত ছোট হয়, জলের প্রতি তার আকর্ষণ সামান্য বাড়তে পারে। কিন্তু চেইন লম্বা হওয়ার সাথে সাথে এটি পুরোপুরি অদ্রবণীয় হয়ে পড়ে। তাপমাত্রা বাড়ালে সাধারণত এদের দ্রবণীয়তা কিছুটা বৃদ্ধি পায়।


 

. ফ্যাটি অ্যাসিডের প্রকারভেদ

রাসায়নিক বন্ধনের প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে ফ্যাটি অ্যাসিড প্রধানত দুই প্রকার:

বৈশিষ্ট্য

সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড (Saturated)

অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড (Unsaturated)

রাসায়নিক বন্ধন

কার্বন পরমাণুগুলোর মধ্যে কেবল একক বন্ধন (Single Bond) থাকে।

এগুলো সোজা হয় এবং ঘনভাবে বিন্যস্ত থাকতে পারে (যেমন: মাখন)।

কার্বন চেইনে এক বা একাধিক দ্বিবন্ধন (Double Bond) থাকে।

দ্বিবন্ধনের স্থানে চেইনটি কিছুটা বেঁকে যায় (Kink), ফলে এগুলো ঘন হতে পারে না এবং তরল থাকে (যেমন: উদ্ভিজ্জ তেল)।

অবস্থা

ঘরের তাপমাত্রায় সাধারণত কঠিন থাকে।

ঘরের তাপমাত্রায় সাধারণত তরল থাকে।

উৎস

প্রাণিজ চর্বি (মাখন, ঘি, মাংসের চর্বি)

উদ্ভিজ্জ তেল (সরিষার তেল, অলিভ অয়েল) এবং মাছের তেল।

প্রভাব

রক্তে কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে।

হৃদপিণ্ডের জন্য সাধারণত ভালো বলে মনে করা হয়।

 

 

 

 

ফ্যাটি অ্যাসিডের কাজ

  • শক্তি উৎপাদন: বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফ্যাটি অ্যাসিড প্রচুর শক্তি বা ATP তৈরি করে। 9.3kcal
  • কোষের গঠন: কোষ পর্দার প্রধান উপাদান ফসফোলিপিড তৈরি করতে ফ্যাটি অ্যাসিড প্রয়োজন।
  • ভিটামিন পরিবহন: চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলোকে  (A, D, E, K) শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।

 

Share:

হাইড্রোফোবিক লেজ (Hydrophobic Tail)

 

হাইড্রোফোবিক লেজ (Hydrophobic Tail) হলো ফসফোলিপিড অণুর সেই অংশ যা জলকে ভয় পায় বা জল থেকে দূরে থাকতে চায়। এটি কোষপর্দার ভেতরের দিকে থাকে এবং একটি অভেদ্য প্রাচীর তৈরি করে।

হাইড্রোফোবিক লেজগুলো মূলত লম্বা ফ্যাটি অ্যাসিড (Fatty Acids) চেইন দিয়ে তৈরি। ফ্যাটি অ্যাসিড চেইনগুলো মূলত হাইড্রোকার্বন (কার্বন এবং হাইড্রোজেনের দীর্ঘ শৃঙ্খল) দিয়ে গঠিত।

সাধারণত একটি ফসফোলিপিড অণুতে দুটি লেজ থাকে:

  • সম্পৃক্ত (Saturated): এই লেজটি একদম সোজা হয়। এটি কোষপর্দাকে শক্ত ঘন করতে সাহায্য করে।
  • অসম্পৃক্ত (Unsaturated): এই লেজটিতে একটি "বাঁক" বা Kink থাকে (Double bond-এর কারণে) এই বাঁকটি লিপিড অণুগুলোকে একে অপরের থেকে দূরে রাখে, যা কোষপর্দাকে নমনীয় বা তরল (Fluid) রাখতে সাহায্য করে।

হাইড্রোফোবিক লেজ কেন জলকে এড়িয়ে চলে?

জলের অণু (H2O) হলো পোলার বা মেরুযুক্ত এর এক প্রান্তে আংশিক ধনাত্মক এবং অন্য প্রান্তে আংশিক ঋণাত্মক আধান থাকে। অন্যদিকে, ফ্যাটি অ্যাসিড চেইন বা হাইড্রোফোবিক লেজ মূলত কার্বন এবং হাইড্রোজেনের একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল। কার্বন হাইড্রোজেনের মধ্যে ইলেকট্রন ভাগাভাগি সমানভাবে হয় বলে এতে কোনো আধান থাকে না। এই -মেরুযুক্ত (Non-polar) বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি জলের (পোলার) সাথে কোনো আকর্ষণ অনুভব করে না।

 

 

Share:

গ্লিসারল (Glycerol)

গ্লিসারল (Glycerol) হলো একটি সহজ সরল জৈব অণু যা আমাদের শরীরের চর্বি বা লিপিড গঠনের প্রধান ভিত্তি। রসায়নের ভাষায় এটি একটি পলিহাইড্রিক অ্যালকোহল। গ্লিসারলের রাসায়নিক সংকেত হলো C3H8O3 . গ্লিসারল (Glycerol) হলো একটি -কার্বন বিশিষ্ট অ্যালকোহল, যা ফসফোলিপিডের মূল কাঠামোর (backbone) অংশ।

৩টি কার্বন (C) এর প্রতিটি কার্বনের সাথে একটি করে –OH (হাইড্রক্সিল) গ্রুপ যুক্ত থাকে. এই  –OH গ্রুপগুলো গ্লিসারলকে আংশিকভাবে পোলার করে.

 

ফসফোলিপিডের সাথে গ্লিসারলের সম্পর্ক:

1. কাঠামোগত সম্পর্ক (Structural Connection)

একটি ফসফোলিপিড অণু মূলত তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত, আর গ্লিসারল থাকে ঠিক মাঝখানে। গ্লিসারলের ৩টি কার্বন পরমাণু ৩টি হাত হিসেবে কাজ করে:

প্রথম দ্বিতীয় হাত (কার্বন): এদের সাথে যুক্ত থাকে দুটি লম্বা ফ্যাটি অ্যাসিড লেজ (Hydrophobic Tails)

তৃতীয় হাত (কার্বন): এর সাথে যুক্ত থাকে একটি ফসফেট গ্রুপ (Hydrophilic Head)

2. সংযোগকারী ভূমিকা (The Linker):

গ্লিসারল জল-বিদ্বেষী (Hydrophobic) লেজ এবং জল-অনুরাগী (Hydrophilic) মাথাকে একসাথে আটকে রাখে। এই বন্ধনটিকে রসায়নের ভাষায় এস্টার বন্ধন (Ester Linkage) বলা হয়। গ্লিসারল না থাকলে এই মাথা এবং লেজ আলাদা হয়ে যেত এবং কোষপর্দা তৈরি হতে পারত

 

3. নমনীয়তা প্রদান

গ্লিসারলের এই কাঠামোর কারণে কোষপর্দা কিছুটা তরল বা নমনীয় থাকে। এটি কোষপর্দাকে নড়াচড়া করতে এবং প্রয়োজনীয় অণু চলাচলে সাহায্য করে।

Share:

হাইড্রোফিলিক মাথা (Hydrophilic Head)

 

হাইড্রোফিলিক মাথা (Hydrophilic Head) হলো ফসফোলিপিড অণুর সেই অংশ যা জলের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সহজ কথায়, এটি লিপিড অণুর "জল-প্রেমী" অংশ।

হাইড্রোফিলিক মাথা (Hydrophilic Head) মূলত তিনটি প্রধান উপাদান নিয়ে গঠিত:

  • ফসফেট গ্রুপ (PO43-): এটি ঋণাত্মক (Negative) আধানযুক্ত।
  • গ্লিসারল (Glycerol): এটি একটি তিন-কার্বন যুক্ত অণু যা ফসফেট এবং ফ্যাটি অ্যাসিডকে যুক্ত রাখে।
  • নাইট্রোজেনযুক্ত অণু (যেমন- কোলিন): এটি অনেক সময় ফসফেটের সাথে যুক্ত থাকে এবং অতিরিক্ত আধান প্রদান করে।

 

হাইড্রোফিলিক মাথা (Hydrophilic Head) কেন জল- প্রতি আকৃষ্ট হয়?

জলের অণু (H2O) মেরুযুক্ত (Polar) ফসফেট গ্রুপের (PO³)ঋণাত্মক আধান এবং এর মেরুতা জলের অণুর সাথে হাইড্রোজেন বন্ধন তৈরি করতে পারে। এই আকর্ষণের কারণেই এটি জলের সংস্পর্শে থাকতে পছন্দ করে।

যেহেতু কোষের বাইরে এবং ভেতরে (সাইটোপ্লাজম) প্রচুর জল থাকে, তাই ফসফোলিপিড অণুগুলো এমনভাবে সাজানো থাকে যাতে তাদের হাইড্রোফিলিক মাথাগুলো জলের দিকে মুখ করে থাকে।

  • বাইরের স্তর: মাথাগুলো কোষের বাইরের তরলের (Extracellular fluid) দিকে থাকে।
  • ভেতরের স্তর: মাথাগুলো কোষের ভেতরের তরলের (Cytosol) দিকে থাকে।

কোষপর্দায় থাকা হাইড্রোফিলিক মাথা (Hydrophilic Head) এর প্রধান কাজ কি?

কোষপর্দায় থাকা হাইড্রোফিলিক মাথা (Hydrophilic Head) মূলত তিনটি প্রধান কাজ করে যা কোষের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি:

1. কোষের গঠনগত স্থায়িত্ব (Structural Stability)

কোষের ভেতরে (সাইটোপ্লাজম) এবং কোষের বাইরেউভয় দিকেই জল থাকে। হাইড্রোফিলিক মাথাগুলো জল-প্রেমী হওয়ায় তারা বাইরের ভেতরের জলের দিকে মুখ করে থাকে। এর ফলে ফসফোলিপিডগুলো নিজে থেকেই একটি সুশৃঙ্খল দ্বি-স্তর (Bilayer) তৈরি করে, যা কোষের আকার ধরে রাখে।

. জলের সাথে সংযোগ স্থাপন (Interacting with Water)

জলের অণুগুলো মেরুযুক্ত (Polar) হওয়ায় তারা সহজেই হাইড্রোফিলিক মাথার ঋণাত্মক আধানযুক্ত ফসফেট গ্রুপের সাথে হাইড্রোজেন বন্ধন তৈরি করতে পারে। এটি কোষের চারপাশে একটি পাতলা জলের স্তর তৈরি করে, যা কোষকে আর্দ্র রাখতে এবং বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সাহায্য করে।

3. সুরক্ষা ছাঁকনি হিসেবে কাজ (Selective Barrier)

এই মাথাগুলো একটি পাহারাদারের মতো কাজ করে। এটি চর্বিতে দ্রবণীয় নয় এমন বড় অণু বা ক্ষতিকারক পদার্থকে সরাসরি ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিন বা চ্যানেলের মাধ্যমেই তখন প্রয়োজনীয় উপাদান কোষে প্রবেশ করতে পারে।

 

4. সিগন্যালিং:

 অনেক সময় বিভিন্ন হরমোন বা প্রোটিন এই মাথার সাথে যুক্ত হয়ে কোষকে কাজ করার সংকেত দেয়।

Share:

Popular Posts

Total Pageviews