1880 সালে আধুনিক বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন (Charles Darwin) এবং তাঁর পুত্র ফ্রান্সিস ডারউইন উদ্ভিদ হরমোন গবেষণার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।
তাঁরা লক্ষ্য করেছিলেন যে, ক্যানারি ঘাসের (Canary grass) ভ্রূণমুকুলাবরণী বা Coleoptile একপাশ থেকে আলো পেলে সেই আলোর উৎসের দিকে বেঁকে যায়।
এই রহস্য উন্মোচনের জন্য তাঁরা কয়েকটি ধাপে পরীক্ষাটি করেন:
ডারউইন Coleoptile ওপর চারটি ভিন্ন অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন:
- স্বাভাবিক অবস্থা (Control): একটি সাধারণ কোলীয়পটাইলে একপাশ থেকে আলো দেওয়া হলো।
ফলাফল: এটি আলোর দিকে বেঁকে গেল।
- ডগা কেটে ফেলা (Decapitated): কোলীয়পটাইলের ডগাটি কেটে বাদ দেওয়া হলো।
ফলাফল: উদ্ভিদটি আর আলোর দিকে বেঁকল না বা বৃদ্ধি পেল না।
- অস্বচ্ছ টুপি (Opaque Cap): কোলীয়পটাইলের ডগাটি একটি আলো-অভেদ্য (অস্বচ্ছ) টুপি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো।
ফলাফল: এটি আলোর দিকে বেঁকল না।
- স্বচ্ছ টুপি (Transparent Cap): ডগাটি একটি স্বচ্ছ কাঁচের টুপি দিয়ে ঢাকা হলো।
ফলাফল: এটি স্বাভাবিকভাবেই আলোর দিকে বেঁকে গেল।
- নিচের অংশ ঢাকা (Base Covered): ডগাটি খোলা রেখে নিচের অংশটি একটি অস্বচ্ছ আবরণ দিয়ে ঢাকা হলো।
ফলাফল: উদ্ভিদটি তবুও আলোর দিকে বেঁকে গেল।
ডারউইনের সিদ্ধান্ত
এই পরীক্ষার মাধ্যমে ডারউইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্তে পৌঁছান:
- সংবেদনশীল অঞ্চল: কোলীয়পটাইলের ডগা (Tip) হলো আলোক সংবেদনশীল অংশ। অর্থাৎ ডগাই আলো শনাক্ত করে।
- সংকেত প্রবাহ: আলো শনাক্ত হয় ডগায়, কিন্তু বেঁকে যাওয়ার ঘটনাটি ঘটে ডগার কিছুটা নিচে। এর থেকে ডারউইন বুঝতে পারেন যে, ডগা থেকে কোনো এক ধরণের "প্রভাব" (Influence) বা সংকেত নিচের দিকে প্রবাহিত হয় যা উদ্ভিদকে বাঁকতে সাহায্য করে।
ডারউইন যদিও জানতেন না যে এই "প্রভাব" আসলে একটি রাসায়নিক হরমোন (অক্সিন), তবুও তাঁর এই পরীক্ষাই পরবর্তীকালে বয়েসেন-জেনসেন এবং ফ্রিটস ওয়েন্ট-এর মতো বিজ্ঞানীদের গবেষণার পথ প্রশস্ত করেছিল।
পিটার বয়েসেন-জেনসেন (Peter Boysen-Jensen) 1913 সালে উদ্ভিদের আলোকবৃত্তি (Phototropism) বা আলোর দিকে বেঁকে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে একটি যুগান্তকারী পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। চার্লস ডারউইনের গবেষণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে, উদ্ভিদের কাণ্ডের ডগা থেকে এক ধরণের রাসায়নিক সংকেত নিচের দিকে প্রবাহিত হয়।
ডারউইন লক্ষ্য করেছিলেন যে, ঘাসজাতীয় উদ্ভিদের ভ্রূণমুকুলাবরণী বা কোলীয়পটাইল (Coleoptile)-এর ডগা আলোর উৎস শনাক্ত করে, কিন্তু বাঁকার প্রক্রিয়াটি ঘটে ডগার কিছুটা নিচে। বয়েসেন-জেনসেন বুঝতে চেয়েছিলেন এই সংকেতটি কীভাবে নিচে পৌঁছায়।
পরীক্ষার ধাপ ও পর্যবেক্ষণ
তিনি কোলীয়পটাইলকে((Coleoptile) দুটি ভিন্ন উপাদানের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন:
জিলেটিন (Gelatin) ব্লক ব্যবহার:
তিনি কোলীয়পটাইলের (Coleoptile) ডগাটি কেটে ফেলেন এবং ডগা ও অবশিষ্টাংশের মাঝে এক টুকরো জিলেটিন (জিলেটিন এমন একটি পদার্থ যা জলের মতো দ্রবণীয় রাসায়নিক পদার্থকে নিজের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে দেয়।)বসিয়ে দেন।
ফলাফল: দেখা গেল উদ্ভিদটি এখনও আলোর দিকে বেঁকে যাচ্ছে।
সিদ্ধান্ত: যেহেতু জিলেটিন একটি জল-দ্রবণীয় এবং সচ্ছিদ্র পদার্থ, তাই এটি প্রমাণ করে যে ডগা থেকে আসা সংকেতটি একটি রাসায়নিক পদার্থ, যা জিলেটিনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।
মাইকা (Mica) বা অভ্র পাত ব্যবহার:
তিনি কোলীয়পটাইলের একপাশে একটি অভ্রের পাত (যা কোনো তরল বা রাসায়নিক পদার্থ চলাচলে বাধা দেয়) প্রবেশ করান।
অন্ধকার দিকে মাইকা: যখন মাইকা পাতটি অন্ধকারের দিকে (আলোর বিপরীত দিকে) ঢোকানো হলো, তখন উদ্ভিদটি আলোর দিকে বেঁকে যেতে পারল না।
আলোকের দিকে মাইকা: যখন পাতটি আলোর দিকে ঢোকানো হলো, তখন উদ্ভিদটি স্বাভাবিকভাবেই আলোর দিকে বেঁকে গেল।
বয়েসেন-জেনসেনের পরীক্ষার মাধ্যমে দুটি প্রধান সত্য উন্মোচিত হয়:
রাসায়নিক প্রকৃতি: উদ্ভিদের এই সংকেতটি কোনো বৈদ্যুতিক প্রবাহ নয়, বরং একটি রাসায়নিক উপাদান (যা পরবর্তীতে অক্সিন হিসেবে চিহ্নিত হয়)।
প্রবাহের দিক: আলোর প্রভাবে এই রাসায়নিক পদার্থটি উদ্ভিদের অন্ধকার বা ছায়াযুক্ত পাশে জমা হয় এবং সেখান দিয়েই নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এই পাশের কোষগুলো বেশি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার ফলেই উদ্ভিদটি আলোর দিকে বেঁকে যায়।
বিজ্ঞানে এর গুরুত্ব
বয়েসেন-জেনসেনের এই 'পারমিবিলিটি টেস্ট' বা ভেদ্যতা পরীক্ষা উদ্ভিদ হরমোন গবেষণায় বিপ্লব ঘটিয়েছিল। তাঁর এই কাজের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে 1926 সালে বিজ্ঞানী ফ্রিটস ওয়েন্ট (Frits Went) সফলভাবে অক্সিন হরমোন পৃথক করতে সক্ষম হন।
1919 সালে হাঙ্গেরীয় উদ্ভিদবিজ্ঞানী আর্পাদ পাল (Arpad Paal) বয়েসেন-জেনসেনের পরীক্ষার ফলাফলকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি পরীক্ষা পরিচালনা করেন। তাঁর এই পরীক্ষাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, আলোর অনুপস্থিতিতেও উদ্ভিদের একদিকের কোষের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটিয়ে উদ্ভিদকে বাঁকানো সম্ভব।
পরীক্ষার ধাপ:
- অন্ধকারে পরীক্ষা: পাল তাঁর সম্পূর্ণ পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে সম্পন্ন করেন যাতে আলোর কোনো প্রভাব না থাকে।
- ডগা কাটা: তিনি একটি ওট (Avena) কোলীয়পটাইলের ডগা কেটে ফেলেন।
- অপ্রতিসম স্থাপন (Asymmetrical Placement): তিনি কাটা ডগাটিকে পুনরায় কোলীয়পটাইলের ওপর বসান, কিন্তু ঠিক মাঝখানে নয়। তিনি ডগাটিকে কাটা অংশের একপাশে (ধরা যাক বাম পাশে) একটু সরিয়ে স্থাপন করেন।
পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল:
পর্যবেক্ষণ: দেখা গেল যে, ডগাটি যে পাশে বসানো হয়েছিল (বাম পাশে), তার বিপরীত দিকে (ডান পাশে) উদ্ভিদটি বেঁকে গেল।
ফলাফল: ডগা থেকে কোনো একটি পদার্থ (যা আমরা এখন অক্সিন বলে জানি) ডগার ঠিক নিচের অংশে প্রবেশ করে এবং সেই পাশের কোষগুলোর দ্রুত বৃদ্ধি ঘটায়। ফলে অন্য পাশে কোষের বৃদ্ধি কম হওয়ায় উদ্ভিদটি বেঁকে যায়।
পালের পরীক্ষার গুরুত্ব ও সিদ্ধান্ত
পালের পরীক্ষাটি উদ্ভিদবিজ্ঞানে দুটি বড় সত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল:
- আলো ছাড়াই বাঁকানো সম্ভব: ডারউইন বা বয়েসেন-জেনসেন আলোর প্রভাবে বাঁকার বিষয়টি দেখেছিলেন। কিন্তু পাল প্রমাণ করেন যে, আলোর অনুপস্থিতিতেও যদি ডগা থেকে আসা রাসায়নিক পদার্থটি একপাশে বেশি পরিমাণে পৌঁছায়, তবে উদ্ভিদটি বেঁকে যাবে।
- অসম বৃদ্ধি (Differential Growth): তিনি প্রথম পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, কোলীয়পটাইলের বাঁকা ভাব মূলত দুই পাশের কোষের অসম বৃদ্ধির ফলেই ঘটে। হরমোন যে পাশে বেশি থাকে, সেই পাশের বৃদ্ধি দ্রুত হয়।
1926 সালে ওলন্দাজ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ফ্রিটস ওয়েন্ট (Frits Went) পিটার বয়েসেন-জেনসেনের গবেষণাকে পূর্ণতা দান করেন। তিনি প্রথমবার উদ্ভিদের ডগা থেকে সেই রহস্যময় রাসায়নিক পদার্থটিকে পৃথক করতে সক্ষম হন এবং এর নাম দেন "অক্সিন" (Auxin)।
পরীক্ষার ধাপসমূহ:
ওয়েন্ট তাঁর পরীক্ষার জন্য ওট (Avena) উদ্ভিদের ভ্রূণমুকুলাবরণী বা কোলীয়পটাইল ব্যবহার করেছিলেন।
ডগা পৃথকীকরণ: তিনি প্রথমে কোলীয়পটাইলের ডগাটি কেটে আলাদা করেন।
আগার ব্লকে স্থাপন: কাটা ডগাগুলোকে তিনি কয়েক ঘণ্টার জন্য আগার (Agar) নামক এক ধরণের জেলির ব্লকের ওপর রেখে দেন। তিনি ধারণা করেছিলেন যে ডগার রাসায়নিক পদার্থটি আগার ব্লকে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে।
ডগাবিহীন কোলীয়পটাইলে স্থাপন: এরপর তিনি ডগাগুলো সরিয়ে ফেলেন এবং শুধুমাত্র সেই আগার ব্লকের ছোট টুকরো নিয়ে ডগাবিহীন কোলীয়পটাইলের ওপর স্থাপন করেন।
পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল
ওয়েন্ট আগার ব্লকের টুকরোগুলোকে দুইভাবে স্থাপন করে ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল লক্ষ্য করেন:
- মাঝখানে স্থাপন: আগার ব্লকটি কোলীয়পটাইলের ঠিক মাঝখানে রাখলে উদ্ভিদটি সোজাভাবে বৃদ্ধি পায়।
- একপাশে (অপ্রতিসম) স্থাপন: যখন তিনি আগার ব্লকের টুকরোটি কাটা অংশের একপাশে (ধরা যাক বাম পাশে) স্থাপন করলেন, তখন দেখা গেল উদ্ভিদটি বিপরীত দিকে (ডান পাশে) বেঁকে যাচ্ছে, যদিও সেখানে কোনো আলো ছিল না।
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
- অক্সিনের আবিষ্কার: ওয়েন্ট প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদের বৃদ্ধি একটি রাসায়নিক পদার্থের ওপর নির্ভরশীল। তিনি এই পদার্থের নাম দেন অক্সিন, যা গ্রিক শব্দ 'Auxein' (বৃদ্ধি পাওয়া) থেকে এসেছে।
- অসম বৃদ্ধি (Unequal Growth): তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, কোলীয়পটাইলের যে পাশে অক্সিন বেশি থাকে, সেই পাশের কোষগুলো দ্রুত বিভাজিত ও দীর্ঘায়িত হয়। ফলে কম অক্সিন থাকা পাশের দিকে উদ্ভিদটি বেঁকে যায়।
- আলোকবৃত্তির কারণ: তিনি নিশ্চিত করেন যে, আলো যখন একপাশ থেকে আসে, তখন অক্সিন অন্ধকার দিকে সরে যায়, ফলে অন্ধকার পাশের কোষগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং উদ্ভিদটি আলোর দিকে বেঁকে যায়।