2-4-5-ট্রাইক্লোরোফেনক্সি অ্যাসিটিক অ্যাসিড

    2,4,5-T (2,4,5-Trichlorophenoxyacetic acid) 2-4-5-ট্রাইক্লোরোফেনক্সি অ্যাসিটিক অ্যাসিড হলো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিতর্কিত কৃত্রিম অক্সিন হরমোন। এটি প্রধানত কাঠের মতো শক্ত কান্ডবিশিষ্ট আগাছা এবং জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য আগাছানাশক (Herbicide) হিসেবে ব্যবহৃত হতো।


রাসায়নিক গঠন ও প্রকৃতি:

 এটি 2,4-D (2,4-ডাইক্লোরোফেনক্সি অ্যাসিটিক অ্যাসিড)-এর সাথে গঠনগতভাবে খুব মিল সম্পন্ন, তবে এতে একটি অতিরিক্ত ক্লোরিন পরমাণু থাকে। 

  • এটি একটি ক্লোরিনযুক্ত ফেনোক্সি যৌগ। 
  •  একটি benzene ring (phenoxy group) থাকে এতে 2, 4 এবং 5 নম্বর অবস্থানে তিনটি ক্লোরিন পরমাণু যুক্ত থাকে 
  •  এর সাথে একটি –CH₂–COOH (acetic acid group) যুক্ত 
  • এর রাসায়নিক সংকেত হলো C8H5Cl3O3



প্রধান কাজ ও ব্যবহার শক্ত আগাছা দমন: 

এটি সাধারণ আগাছানাশকের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। এটি মূলত ঝোপঝাড় এবং বড় বড় কাঠের মতো গাছ (Woody plants) ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয়। 

 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: 

 2,4,5-T তৈরির সময় উপজাত (By-product) হিসেবে TCDD নামক একটি অত্যন্ত বিষাক্ত ডাইঅক্সিন (Dioxin) তৈরি হয়। এটি মানুষের শরীরে ক্যানসার, জন্মগত ত্রুটি এবং ভয়াবহ চর্মরোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণে বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশে (ভারত সহ) 2,4,5-T (2,4,5-Trichlorophenoxyacetic acid) নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কৃষিকাজে এখন এর পরিবর্তে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে 2,4-D(2,4-ডাইক্লোরোফেনক্সি অ্যাসিটিক অ্যাসিড) বা অন্যান্য আধুনিক হার্বিসাইড ব্যবহার করা হয়।

Share:

2,4-ডাইক্লোরোফেনক্সি অ্যাসিটিক অ্যাসিড(2,4-D)

2,4-D (2,4-Dichlorophenoxyacetic acid) 2,4-ডাইক্লোরোফেনক্সি অ্যাসিটিক অ্যাসিড হলো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বহুল ব্যবহৃত কৃত্রিম অক্সিন হরমোন, যা মূলত আগাছানাশক (Weedicide/Herbicide) হিসেবে পরিচিত। এটি মূলত প্রাকৃতিক অক্সিন হরমোনের (IAA) একটি কৃত্রিম বিকল্প, যা উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিকভাবে ত্বরান্বিত করে তাকে ধ্বংস করে ফেলে।


রাসায়নিক গঠন ও প্রকৃতি:

  1.  এটি একটি ক্লোরিনযুক্ত ফেনোক্সি যৌগ।  
  2. একটি benzene ring (phenoxy group) থাকে 
  3.  এতে 2 ও 4 নম্বর অবস্থানে Cl (chlorine) যুক্ত এর সাথে একটি –CH₂–COOH (acetic acid group) যুক্ত। 
  4. এর রাসায়নিক সংকেত হলো C8H6Cl2O3




প্রধান কাজ ও ব্যবহার

আগাছানাশক হিসেবে: এটি মূলত দ্বিবীজপত্রী (Dicot) আগাছা দমনে ব্যবহৃত হয়। ধান, গম বা ভুট্টার মতো একবীজপত্রী শস্যক্ষেত্রে যখন দ্বিবীজপত্রী আগাছা জন্মায়, তখন এটি স্প্রে করলে শস্যের ক্ষতি না করে কেবল আগাছাগুলো মারা যায়। এটি একটি সিলেক্টিভ হার্বিসাইড; অর্থাৎ এটি নির্দিষ্ট ধরণের উদ্ভিদকে (দ্বিবীজপত্রী) লক্ষ্য করে কাজ করে। 

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: 'এজেন্ট অরেঞ্জ' (Agent Orange) ভিয়েতনামের যুদ্ধে ব্যবহৃত কুখ্যাত 'এজেন্ট অরেঞ্জ' নামক রাসায়নিক মিশ্রণটির অর্ধেক উপাদান ছিল এই 2,4-D (বাকি অর্ধেক ছিল 2,4,5-T)। এটি জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য ব্যাপকভাবে আকাশ থেকে ছিটানো হয়েছিল।

Share:

NAA - ন্যাফথালিন অ্যাসিটিক অ্যাসিড

    NAA - ন্যাফথালিন অ্যাসিটিক অ্যাসিড (Naphthaleneacetic acid) হলো একটি কৃত্রিম উদ্ভিদ হরমোন যা 'অক্সিন' (Auxin) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এটি কৃষিকাজ এবং উদ্যানপালনে (Horticulture) ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। প্রাকৃতিক অক্সিন (Indole-3-acetic acid (IAA)) খুব দ্রুত আলো বা এনজাইমের প্রভাবে নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু NAA অনেক বেশি স্থিতিশীল (Stable)। এটি অনেকক্ষণ উদ্ভিদের টিস্যুতে কার্যকর থাকে এবং সহজে ভেঙে যায় না।


রাসায়নিক গঠন (Chemical Structure):

 NAA হলো একটি সিন্থেটিক বা কৃত্রিম অক্সিন। এর গঠন মূলত দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত:

  1.  ন্যাপথলিন রিং (Naphthalene Ring): এর কেন্দ্রে দুটি বেনজিন রিং যুক্ত থাকে, যাকে ন্যাপথলিন নিউক্লিয়াস বলা হয়। ন্যাপথলিন রিং থাকার কারণে এটি উদ্ভিদের পাতার মোমের আস্তরণ (Cuticle) ভেদ করে সহজে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। 
  2. অ্যাসিটিক অ্যাসিড গ্রুপ (Acetic Acid Group): ন্যাপথলিন রিং-এর ১ নম্বর কার্বন অবস্থানের সাথে একটি অ্যাসিটিক অ্যাসিড পার্শ্বশৃঙ্খল (Side chain) যুক্ত থাকে। এই অ্যাসিডিক গ্রুপটি উদ্ভিদের কোষের রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয়ে কোষ বিভাজনের সংকেত পাঠায়। রাসায়নিক সংকেত: C12H10O2



প্রধান কাজ ও ব্যবহার (Main Functions & Uses)

  •  শিকড় গজানো (Rooting Agent): কলম বা কাটিং থেকে নতুন চারা তৈরির সময় এটি ব্যবহার করা হয়। ডালের গোড়ায় NAA প্রয়োগ করলে খুব দ্রুত এবং শক্তিশালী শিকড় গজায়। 
  • অকাল ফল ঝরা রোধ (Prevents Fruit Drop): আম, লেবু, লিচু বা আপেলের মতো ফল পাকার আগেই ঝরে পড়া রোধ করতে এটি গাছে স্প্রে করা হয়। 
  • ফলের আকার বৃদ্ধি (Fruit Thinning and Growth): অনেক সময় গাছে অতিরিক্ত ফল আসলে কিছু ফল ঝরিয়ে দিয়ে বাকিগুলোর আকার বড় এবং মানসম্মত করতে এটি সাহায্য করে। 
  • ফুলের সংখ্যা বৃদ্ধি (Flowering): এটি উদ্ভিদে স্ত্রী ও পুরুষ ফুলের অনুপাত পরিবর্তন করতে এবং তাড়াতাড়ি ফুল আনতে সাহায্য করে (যেমন: শসা বা কুমড়ো জাতীয় ফসলে) 
  • টিস্যু কালচার (Tissue Culture): গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে চারা তৈরির সময় কোষ বিভাজন এবং শিকড় তৈরির জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।

Share:

4-ক্লোরো-ইনডোল-3-অ্যাসিটিক অ্যাসিড

   4-ক্লোরো-ইনডোল--অ্যাসিটিক অ্যাসিড (4-Cl-IAA) হলো প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন এক ধরণের শক্তিশালী অক্সিন, যা সাধারণত মটর (Pea), শিম (Broad bean) এবং অন্যান্য লেগুমিনাস (Leguminous) উদ্ভিদে পাওয়া যায়। এটি সাধারণ অক্সিন (IAA)-এর একটি ক্লোরিনেটেড সংস্করণ।

রাসায়নিক গঠন প্রকৃতি

এটি সাধারণ IAA-এর মতোই ইন্ডোল--অ্যাসিটিক অ্যাসিড, তবে এর ইন্ডোল বলয়ের 4 নম্বর অবস্থানে একটি ক্লোরিন (Cl) পরমাণু যুক্ত থাকে।

  • আণবিক সংকেত: C_10H_8ClNO_2
  • বৈশিষ্ট্য: ক্লোরিন পরমাণুর উপস্থিতির কারণে এটি সাধারণ IAA-এর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর এবং স্থিতিশীল।

 কেন এটি সাধারণ IAA থেকে আলাদা?

  • অধিক কার্যকারিতা: গবেষণায় দেখা গেছে যে, নির্দিষ্ট কিছু কাজের ক্ষেত্রে (যেমনকোষের প্রসারণ) এটি সাধারণ IAA-এর তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী হতে পারে।
  • প্রতিরোধ ক্ষমতা: উদ্ভিদের ভেতরে অক্সিন ধ্বংসকারী এনজাইমগুলো (যেমন—IAA oxidase) একে সহজে ভাঙতে পারে না, কারণ ক্লোরিন পরমাণু একে সুরক্ষা দেয়।

প্রধান কাজসমূহ

 ফলের বৃদ্ধি: মটরশুঁটির বীজের বিকাশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বীজ থেকে ডিম্বাশয়ে সংকেত পাঠায় যাতে ফলটি পুষ্ট হয়।

অকাল পতন রোধ: ফল বা পাতা যাতে সময়ের আগেই ঝরে না পড়ে, তাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রোটিন সংশ্লেষণ: এটি কোষে RNA এবং প্রোটিন সংশ্লেষণ ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে সাধারণ অক্সিনের চেয়ে বেশি সক্রিয়।


উৎস

এটি মূলত উদ্ভিদের কচি ফল এবং বীজে বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে মটর (Pisum sativum) এবং ল্যাথাইরাস (Lathyrus) গণভুক্ত উদ্ভিদগুলোতে এর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে।

Share:

ফিনাইলঅ্যাসেটিক অ্যাসিড

 

 

ফিনাইলঅ্যাসেটিক অ্যাসিড non-indole auxin (IAA-এর মতো indole ring নেই),উদ্ভিদে স্বাভাবিকভাবেই অল্প পরিমাণে থাকে ,ধীরে কাজ করে কিন্তু স্থায়ী প্রভাব রাখতে পারে.

এটি মূলত অ্যামাইনো অ্যাসিড ফিনাইলঅ্যালানিন (Phenylalanine) থেকে সংশ্লেষিত হয়।

IAA যেমন একটি নির্দিষ্ট দিকে (ওপর থেকে নিচে) চলাচল করে, PAA সেভাবে চলে না। এটি উদ্ভিদের সংবহন কলার (Vascular tissue) মাধ্যমে সব দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

PAA-এর একটি বিশেষ গুণ হলো এর অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল (Anti-microbial) ক্ষমতা। এটি উদ্ভিদকে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ছত্রাক থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

কেন PAA গুরুত্বপূর্ণ?

গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতিকূল পরিবেশে যখন IAA-এর মাত্রা কমে যায় বা IAA ভেঙে যায়, তখন PAA উদ্ভিদের বৃদ্ধি বজায় রাখতে বিকল্প অক্সিন হিসেবে কাজ করে। এটি মূলত উদ্ভিদের একটি ব্যাকআপ সিস্টেমের মতো কাজ করে

Share:

IBA (Indole-3-butyric acid)

 

IBA (Indole-3-butyric acid) হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ auxin (উদ্ভিদ হরমোন), যা উদ্ভিদের বৃদ্ধি বিশেষ করে root formation (মূল গঠন)- বড় ভূমিকা রাখে।

IBA বা Indole-3-Butyric Acid হলো একটি শক্তিশালী এবং বহুল ব্যবহৃত অক্সিন হরমোন। এটি প্রাকৃতিক কৃত্রিম উভয় ভাবেই পাওয়া যায়, তবে কৃষিক্ষেত্রে কৃত্রিম IBA-এর প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি। এটি IAA-এর তুলনায় অধিক স্থিতিশীল, কারণ উদ্ভিদের ভেতরের এনজাইমগুলো একে সহজে ভেঙে ফেলতে পারে না।

প্রাকৃতিক অক্সিন (IAA) থাকার পরেও বিজ্ঞানীরা কেন IBA-কে প্রাধান্য দেন?

 স্থায়িত্ব: IAA আলোতে বা এনজাইমের প্রভাবে খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু IBA দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকে।

 পরিবহন: IBA কোষে খুব একটা চলাচল করে না (Non-polar transport), ফলে এটি যেখানে প্রয়োগ করা হয় ঠিক সেখানেই মূল গজাতে সাহায্য করে।

কার্যকারিতা: এটি সব ধরণের উদ্ভিদে (যেমনফুল গাছ, ফলের গাছ বা ক্যাকটাস) সমানভাবে কাজ করে।

 

Share:

ইন্ডোল-৩-পাইরুভিক অ্যাসিড (IPA) পথ

ইন্ডোল-3পাইরুভিক অ্যাসিড (IPA) পথ: এটি উদ্ভিদের প্রধান অক্সিন সংশ্লেষণ পথ। এটি দুটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হয়:

অ্যামিনো ট্র্যান্সফার (Aminotransfer): প্রথমে TAA1 নামক এনজাইমের উপস্থিতিতে L-Tryptophan তার অ্যামিনো গ্রুপ হারায় এবং Indole-3-Pyruvic Acid (IPA)- পরিণত হয়।

ডিকার্বক্সিলেশন (Decarboxylation): এরপর YUCCA নামক এক ধরণের এনজাইম (Flavin monooxygenase) IPA-কে সরাসরি IAA-তে রূপান্তরিত করে।

 


অন্যান্য সম্ভাব্য পথ (Alternative Pathways) 

উদ্ভিদের প্রজাতি এবং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আরও কিছু পথে IAA তৈরি হতে পারে:

  •  TAM (Tryptamine) পথ: এখানে ট্রিপটোফ্যান প্রথমে ডিকার্বক্সিলেশন প্রক্রিয়ায় ট্রিপটামাইন (Tryptamine) তৈরি করে, যা পরে জারিত হয়ে IAA উৎপন্ন করে।
  •  IAN (Indole-3-Acetonitrile) পথ: কিছু নির্দিষ্ট উদ্ভিদ পরিবারে (যেমন: ব্রাসিকেসি) ট্রিপটোফ্যান থেকে প্রথমে ইন্ডোল-৩-অ্যাসিট্যালডক্সিম এবং পরে ইন্ডোল-৩-অ্যাসিটোনাইট্রাইল (IAN) তৈরি হয়। সবশেষে নাইট্রিলেজ এনজাইমের সাহায্যে এটি IAA-তে পরিণত হয়।
  •  IAM (Indole-3-Acetamide) পথ: এটি মূলত উদ্ভিদে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়, তবে কিছু উদ্ভিদেও এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

Share:

Acid Growth Hypothesis

 



Acid Growth Hypothesis হলো এমন একটি তত্ত্ব যা ব্যাখ্যা করে কীভাবে উদ্ভিদ হরমোন অক্সিন (প্রধানত IAA) কোষ প্রাচীরের প্রসারণ ঘটিয়ে উদ্ভিদের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটায়। 

 এই প্রক্রিয়ার মূল ধাপগুলো নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হলো: 

  1.  প্রোটন পাম্পের সক্রিয়করণ (Activation of Proton Pumps):

     অক্সিন (IAA) কোষের প্লাজমা মেমব্রেনে থাকা H+-ATPase (Proton Pump)-কে সক্রিয় করে। এর ফলে কোষের সাইটোপ্লাজম থেকে প্রোটন (H+ আয়ন) কোষ প্রাচীরের (Cell wall) দিকে পাম্প হতে থাকে।

  2. কোষ প্রাচীরের অম্লকরণ (Acidification of the Cell Wall):

     প্রোটন পাম্পের ক্রমাগত কার্যকারিতার ফলে কোষ প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে (Apoplast) H+ আয়নের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। এর ফলে কোষ প্রাচীরের pH কমে যায় (অর্থাৎ পরিবেশটি অম্লীয় বা Acidic হয়, সাধারণত pH 4.5 - 5.0 এর মধ্যে থাকে)। এই কারণেই একে "Acid Growth" বলা হয়। 

  3. এক্সপ্যানসিন প্রোটিনের সক্রিয়তা (Activation of Expansins):

    অম্লীয় পরিবেশে কোষ প্রাচীরে থাকা বিশেষ ধরনের এনজাইম বা প্রোটিন, যাকে Expansin (এক্সপ্যানসিন) বলা হয়, তা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই প্রোটিনগুলো সেলুলোজ মাইক্রোফাইব্রিল এবং হেমিসেলুলোজের মধ্যকার হাইড্রোজেন বন্ধনগুলোকে (Hydrogen bonds) শিথিল বা দুর্বল করে দেয়।

  4. কোষ প্রাচীরের প্রসারণ (Cell Wall Loosening): যখন হাইড্রোজেন বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে যায়, তখন কোষ প্রাচীর নমনীয় বা প্রসারণযোগ্য হয়ে ওঠে। একে বলা হয় "Wall Loosening"।
  5. টারগার প্রেশার ও বৃদ্ধি (Turgor Pressure and Growth):যেহেতু কোষ প্রাচীর এখন নরম, তাই কোষের ভেতরে থাকা টারগার প্রেশার (অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় জল প্রবেশের ফলে সৃষ্ট চাপ) কোষকে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে কোষটি লম্বা হয়ে প্রসারিত হয়।

    Share:

    ইন্ডোল রিং (Indole Ring)

    ইন্ডোল রিং (Indole Ring) হলো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জৈব রাসায়নিক কাঠামো, যা অনেক প্রয়োজনীয় জৈবিক অণুর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এটি একটি বিষমচাক্রিক (Heterocyclic) অ্যারোমেটিক জৈব যৌগ। 

    রাসায়নিক গঠন


    ইন্ডোল রিং মূলত দুটি রিং বা বলয়ের সমন্বয়ে গঠিত: 

    • বেনজিন রিং (Benzene Ring): একটি ছয় কার্বনবিশিষ্ট অ্যারোমেটিক বলয়। 
    • পাইরোল রিং (Pyrrole Ring): একটি পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট বলয়, যাতে একটি নাইট্রোজেন পরমাণু থাকে। এই দুটি বলয় একত্রে ফিউজড (Fused) হয়ে ইন্ডোল রিং গঠন করে। 
    এর রাসায়নিক সংকেত হলো C8H7N। 

     অক্সিন (IAA): উদ্ভিদের প্রধান বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক হরমোন ইন্ডোল-৩-অ্যাসিটিক অ্যাসিডের মূল কাঠামো হলো এই ইন্ডোল বলয়। 

     অ্যামাইনো অ্যাসিড: প্রোটিন তৈরির অন্যতম উপাদান ট্রিপটোফ্যান (Tryptophan) একটি ইন্ডোল বলয় ধারণ করে। 

     সেরোটোনিন (Serotonin): মানুষের মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটার যা মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তাতেও এই গঠনটি বিদ্যমান।

    Share:

    IAA বা Indole-3-Acetic Acid

    IAA বা Indole-3-Acetic Acid হলো উদ্ভিদের সবচেয়ে পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অক্সিন হরমোন। এটি উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং বিকাশের প্রতিটি ধাপ নিয়ন্ত্রণ করে। 

     1. রাসায়নিক প্রকৃতি ও গঠন: 


     IAA রাসায়নিকভাবে একটি ইন্ডোল বলয় এবং একটি অ্যাসিটিক অ্যাসিড পার্শ্ব-শৃঙ্খল (Side chain) নিয়ে গঠিত। আণবিক সংকেত: C10H9NO2। 

     2. উৎপত্তি: 

     উদ্ভিদের যেসব অংশে কোষ বিভাজন দ্রুত ঘটে এবং বৃদ্ধি বেশি হয়, সেখানেই সাধারণত IAA সংশ্লেষিত হয়:

    •  ভ্রূণমুকুলাবরণী (Coleoptile): এটি অক্সিনের অন্যতম প্রধান উৎস। 
    •  কাণ্ড ও মূলের অগ্রভাগ (Apical Meristems): কান্ড এবং মূলের একদম ডগার অংশে থাকা ভাজক কলা থেকে প্রচুর পরিমাণে IAA তৈরি হয়।
    •  কচি পাতা (Young Leaves): ক্রমবর্ধমান কচি পাতায় উচ্চ মাত্রায় অক্সিন পাওয়া যায়। 
    •  বিকাশমান ফল ও বীজ (Developing Fruits and Seeds): পরাগায়ন ও নিষিক্তকরণের পর ডিম্বাশয় এবং বীজে IAA-এর ঘনত্ব বেড়ে যায়, যা ফলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। 
    •  পরাগরেণু (Pollen): পরাগরেণুর মধ্যেও কিছু পরিমাণ IAA থাকে।
    IAAমূলত উদ্ভিদের বর্ধনশীল অংশে (যেমন—কাণ্ডের ডগা, কচি পাতা) ট্রিপটোফ্যান নামক অ্যামাইনো অ্যাসিড থেকে তৈরি হয়। উদ্ভিদের কোষে Tryptophan নামক অ্যামাইনো অ্যাসিডটি কয়েকটি ধাপে পরিবর্তিত হয়ে ইন্ডোল-৩-অ্যাসিটিক অ্যাসিড (IAA) তৈরি করে। যেমন-ইন্ডোল-৩-পাইরুভিক অ্যাসিড (IPA) পথ। এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় দস্তা (Zn) একটি অপরিহার্য মৌল হিসেবে কাজ করে। মাটি থেকে দস্তার অভাব হলে উদ্ভিদে ট্রিপটোফ্যান থেকে অক্সিন তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, যার ফলে গাছ খর্বাকৃতি হয়ে যায় (যেমন: লিটল লিফ রোগ)।

     __________________________________________________________________________________

     3. IAA-এর প্রধান কাজসমূহ: 
    •  কোষের দীর্ঘীকরণ (Cell Elongation): IAA কোষ প্রাচীরকে নমনীয় করে এবং কোষের ভেতরে জল প্রবেশের মাধ্যমে কোষকে লম্বায় বড় হতে সাহায্য করে (অ্যাসিড গ্রোথ হাইপোথিসিস)
    • অগ্ৰস্থ প্রকটতা (Apical Dominance): উদ্ভিদের কাণ্ডের ডগায় অক্সিনের উপস্থিতি পার্শ্বীয় মুকুলের বৃদ্ধি থামিয়ে দেয় এবং উদ্ভিদকে লম্বায় বাড়তে সাহায্য করে। একেই অগ্রস্থ প্রকটতা বলা হয়। ডগা কেটে দিলে পার্শ্বীয় মুকুলগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। 
    • ফটোট্রপিজম (Phototropism),আলোকবর্তী চলন: অক্সিন হরমোন আলোর প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। যখন উদ্ভিদের কাণ্ডের একপাশ থেকে আলো আসে, তখন অক্সিন আলোর দিকে না থেকে অন্ধকারের দিকে বা ছায়ার দিকে সরে যায়। একে অক্সিনের পার্শ্বীয় পরিবহন (Lateral redistribution) বলা হয়। ছায়ার দিকে যেখানে অক্সিন বেশি থাকে, সেখানে এটি কোষ প্রাচীরে প্রোটন পাম্প সক্রিয় করে দেয় (Acid Growth Hypothesis)। এর ফলে কোষ প্রাচীর নমনীয় হয় এবং জল শোষণের মাধ্যমে কোষটি দ্রুত লম্বা হয়ে যায়| যেহেতু ছায়ার দিকের কোষগুলো আলোর দিকের তুলনায় বেশি লম্বা হয়, তাই কাণ্ডটি ধীরে ধীরে আলোর উৎসের দিকে বেঁকে যায়। এই বিশেষ চলনই উদ্ভিদকে সূর্যালোক পেতে সাহায্য করে। যা পুরো উদ্ভিদটিকে আলোর অভিমুখে ঘুরিয়ে দেয়। 
    • জিওট্রপিজম (Geotropism): অভিকর্ষের প্রভাবে উদ্ভিদের মূল বা কাণ্ডের যে চলন ঘটে, তাকে জিওট্রপিজম (Geotropism) বলা হয়। যখন কোনো উদ্ভিদকে অনুভূমিকভাবে (শুয়িয়ে) রাখা হয়, তখন অভিকর্ষের প্রভাবে অক্সিন কাণ্ড বা মূলের নিচের দিকে বেশি জমা হতে শুরু করে। তবে কাণ্ড এবং মূলের ওপর অক্সিনের প্রভাব সম্পূর্ণ বিপরীত: 
      1. কাণ্ডের ক্ষেত্রে (Negative Geotropism): নিচের দিকে অক্সিনের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সেখানকার কোষগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায়।এর ফলে কাণ্ডের নিচের দিক বেশি লম্বা হয় এবং ডগাটি উপরের দিকে বা অভিকর্ষের বিপরীতে বেঁকে যায়। 
      2.  মূলের ক্ষেত্রে (Positive Geotropism): মূল অক্সিনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। মূলের নিচের দিকে অক্সিনের ঘনত্ব বেড়ে গেলে সেখানে কোষের বৃদ্ধি কমে যায় (Inhibition)। উপরের দিকে অক্সিন কম থাকায় সেখানকার কোষগুলো তুলনামূলক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে মূলটি নিচের দিকে বা অভিকর্ষের অনুকূলে বেঁকে যায়। 
    • মূলের সূচনা (Root Initiation): কাণ্ডের তুলনায় মূলের কোষগুলো অক্সিনের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। কাণ্ডে যে পরিমাণ অক্সিন বৃদ্ধি ঘটায়, মূলে সেই একই পরিমাণ অক্সিন বৃদ্ধিতে বাধা (Inhibition) দেয়। অত্যন্ত কম ঘনত্বের অক্সিন মূলের কোষ বিভাজন এবং বৃদ্ধির জন্য আদর্শ। মূলে যদি অক্সিনের ঘনত্ব বেড়ে যায়, তবে এটি কোষে ইথিলিন (Ethylene) নামক গ্যাসীয় হরমোন তৈরিতে উদ্দীপনা দেয়। ইথিলিন মূলের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি থামিয়ে দেয়। তাই মূলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য অক্সিনের ঘনত্ব কম থাকা জরুরি।কম ঘনত্বের IAA কাণ্ডের কাটিং বা কলম থেকে মূল গজাতে সাহায্য করে। 
    •  ফলের বিকাশ: পরাগায়ন ও নিষিক্তকরণের পর ডিম্বাশয়ে IAA-এর পরিমাণ বেড়ে যায়, যা ফল গঠনে সাহায্য করে। বীজহীন ফল (যেমন: লেবু, আঙুর, তরমুজ) উৎপাদনে IAA-এর প্রভাব অপরিসীম, যাকে পার্থেনোকার্পি বলা হয়। 
    • মোচন রোধ (Prevention of Abscission): যখন কোনো পাতা বা ফল বয়স্ক হয়ে যায়, তখন তার বোঁটার গোড়ায় এক বিশেষ ধরনের কোষের স্তর তৈরি হয় যাকে মোচন স্তর (Abscission Layer) বলে। এই স্তরের কোষগুলো নরম হয়ে যায় এবং একসময় অঙ্গটি গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কচি পাতা বা ফলে অক্সিনের (IAA) ঘনত্ব বেশি থাকে। যতক্ষণ এই অঙ্গগুলো থেকে পর্যাপ্ত অক্সিন বোঁটার দিকে প্রবাহিত হয়, ততক্ষণ মোচন স্তর গঠিত হতে পারে না। এই অকালপক্কতা রোধ করতে কৃত্রিম অক্সিন স্প্রে করা হয়, যা মোচন স্তরের এনজাইমগুলোকে (যেমন- সেলুলেজ) নিষ্ক্রিয় রাখে। 
     4. উদ্ভিদদেহে অক্সিন বা IAA (Indole-3-Acetic Acid)-এর পরিবহন পদ্ধতি

     উদ্ভিদদেহে অক্সিন বা IAA (Indole-3-Acetic Acid)-এর পরিবহন পদ্ধতি অত্যন্ত অনন্য, যাকে পোলার ট্রান্সপোর্ট (Polar Transport) বা মেরুসংলগ্ন পরিবহন বলা হয়। এই প্রক্রিয়াটি মূলত একমুখী এবং এটি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ওপর নির্ভর করে না। 
     নিচে এর কার্যপদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো: 
    1.  মেরুসংলগ্ন পরিবহনের প্রকৃতি (Unidirectional Flow) IAA সাধারণত উদ্ভিদের অগ্রভাগ (Apex) থেকে নিচের দিকে অর্থাৎ কাণ্ডের গোড়ার দিকে পরিবাহিত হয়। একে ব্যাসিপেটাল (Basipetal) পরিবহন বলে। মূলের ক্ষেত্রে এটি অগ্রভাগ থেকে উপরের দিকে (Acropetal) পরিবাহিত হতে পারে। এই সুনির্দিষ্ট অভিমুখ উদ্ভিদ অঙ্গের সঠিক বৃদ্ধি ও গঠন নিশ্চিত করে। 
    2.  পরিবহন মাধ্যম অক্সিন মূলত সংবহন কলার (Phloem) মাধ্যমে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, কিন্তু কোষ থেকে কোষে স্বল্প দূরত্বের মেরুসংলগ্ন পরিবহন ঘটে বিশেষ কিছু প্রোটিন বাহকের সাহায্যে। 
    3.  কেমিওসমোটিক মডেল (Chemiosmotic Model) অক্সিন পরিবহনের এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটি মূলত কোষের ভেতরের এবং বাইরের pH পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে: 
      • কোষে প্রবেশ (Influx): কোষ প্রাচীরের অম্লীয় পরিবেশে (pH প্রায় 5.5) IAA প্রোটন গ্রহণ করে আধানহীন (IAAH) অবস্থায় থাকে, যা সহজেই প্লাজমা মেমব্রেন ভেদ করে কোষে ঢুকতে পারে। এছাড়া AUX1 নামক বিশেষ প্রোটিন বাহক একে কোষে ঢুকতে সাহায্য করে। 
      • সাইটোপ্লাজমে অবস্থা: কোষের ভেতরে pH তুলনামূলক বেশি (প্রায় 7.0) হওয়ায় IAAH ভেঙে আয়নে (IAA-) পরিণত হয়। এই আয়নিত অবস্থা মেমব্রেন ভেদ করে নিজে থেকে বের হতে পারে না। 
      • কোষ থেকে নির্গমন (Efflux): কোষের নিচের দিকে থাকা বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন, যাকে PIN Proteins বলা হয়, এই IAA- আয়নকে কোষ থেকে বের করে নিচের কোষের দিকে পাঠিয়ে দেয়। 
      • PIN প্রোটিনের ভূমিকা অক্সিন পরিবহনের অভিমুখ নির্ধারিত হয় PIN প্রোটিন কোষের কোন দিকে অবস্থান করছে তার ওপর। এই প্রোটিনগুলো সাধারণত কোষের নিচের দিকে (Basal side) সাজানো থাকে, যার ফলে অক্সিন সবসময় উপর থেকে নিচে নামে। এই প্রক্রিয়ায় শক্তি (ATP) ব্যয় হয়, তাই এটি একটি সক্রিয় পরিবহন (Active Transport)।

    Share:

    Popular Posts

    Total Pageviews