পিউরিন রিং(Purine Ring)

    পিউরিন রিং(Purine Ring) হলো নাইট্রোজেনযুক্ত একটি দ্বি-বলয় (double ring) জৈব গঠন, যা একটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট pyrimidine ring এবং একটি পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট imidazole ring যুক্ত হয়ে তৈরি হয়। যা আমাদের শরীরের জেনেটিক কোড (DNA ও RNA) তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

পিউরিন রিং একটি দ্বি-বলয় (Double ring) বিশিষ্ট গঠন। এটি মূলত দুটি ভিন্ন ধরণের রিং-এর মিলনে তৈরি হয়: 

  1. পিরিমিডিন রিং (6-membered): এতে 4টি কার্বন এবং 2টি নাইট্রোজেন থাকে।
  2.  ইমিডাজল রিং (5-membered): এতে 3টি কার্বন এবং 2টি নাইট্রোজেন থাকে। 
এই দুটি রিং একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে মোট 9টি সদস্য বিশিষ্ট একটি বড় বলয় তৈরি করে। এই 9টি অবস্থানের মধ্যে 1, 3, 7 এবং 9 নম্বর অবস্থানে নাইট্রোজেন (N) পরমাণু থাকে। 

Purine = Pyrimidine ring + Imidazole ring 


 নিউক্লিক অ্যাসিডে পিউরিন

 ডিএনএ (DNA) এবং আরএনএ (RNA)-তে মূলত দুই ধরণের পিউরিন ক্ষারক বা বেস পাওয়া যায়:

  •  অ্যাডেনিন (Adenine - A): এটি DNA এবং RNA উভয়ক্ষেত্রেই থাকে। এর রাসায়নিক নাম 6-অ্যামিনোপিউরিন। 
  • গুয়ানিন (Guanine - G): এটিও DNA এবং RNA উভয়ক্ষেত্রেই থাকে। এর রাসায়নিক নাম 2-অ্যামিনো-6-অক্সোপিউরিন। 

জৈবিক গুরুত্ব 

  • জেনেটিক তথ্য বহন: পিউরিন বেসগুলো (A এবং G) পিরিমিডিন বেসগুলোর সাথে হাইড্রোজেন বন্ধনী তৈরি করে ডিএনএ-র সিঁড়ির মতো গঠন তৈরি করে। (অ্যাডেনিন সব সময় থাইমিনের সাথে এবং গুয়ানিন সব সময় সাইটোসিনের সাথে যুক্ত হয়)। 
  • শক্তির উৎস: কোষের শক্তির প্রধান উৎস ATP (Adenosine Triphosphate)-এর মূল গঠন হলো একটি অ্যাডেনিন পিউরিন রিং। 
  • বিপাক প্রক্রিয়া: কো-এনজাইম (যেমন: NAD, FAD) তৈরিতে পিউরিন অপরিহার্য। 

কোথায় পাওয়া যায়? 

  • DNA 
  •  RNA
  •  ATP 
  •  কিছু উদ্ভিদ হরমোন যেমন Kinetin 

একটি পিউরিন ক্ষারকের নাম লেখো।

 উত্তর: অ্যাডেনিন বা গুয়ানিন। 

 পিউরিন রিং কোন দুটি রিং-এর সমষ্টি? 

 উত্তর : পিরিমিডিন এবং ইমিডাজল।


Share:

ইমিডাজল রিং (Imidazole Ring)


ইমিডাজল রিং (Imidazole Ring) হলো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষমচক্রীয় (Heterocyclic) জৈব অণু।
  

 রাসায়নিক গঠন:

 ইমিডাজল রিং-এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: 

  1. এটি একটি পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট (5-membered ring) অ্যারোম্যাটিক বলয়। 
  2. এই বলয়ে 3টি কার্বন (C) এবং 2টি নাইট্রোজেন (N) পরমাণু থাকে। 
  3. নাইট্রোজেন পরমাণু দুটি বলয়ের 1 নম্বর এবং 3 নম্বর অবস্থানে থাকে। 
  4. এর সাধারণ আণবিক সংকেত হলো C3H4N2। 
 
জীববিজ্ঞানে ইমিডাজল-এর ভূমিকা:

 ইমিডাজল রিং প্রাকৃতিকভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জৈব অণুর মধ্যে পাওয়া যায়:- 

  1. হিস্টিডিন (Histidine): এটি একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড, যার পার্শ্বশৃঙ্খলে (Side chain) ইমিডাজল রিং থাকে। এনজাইমের সক্রিয় স্থানে (Active site) এটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
  2.  হিস্টামিন (Histamine): হিস্টিডিন থেকে তৈরি এই অণুটি আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখে।
  3.  পিউরিন (Purine): ডিএনএ এবং আরএনএ-র অন্যতম উপাদান হলো পিউরিন। এই পিউরিন মূলত একটি পিরিমিডিন রিং এবং একটি ইমিডাজল রিং-এর সমন্বয়ে গঠিত। 

ওষুধ ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার:

 ইমিডাজল রিং-এর ওপর ভিত্তি করে অনেক আধুনিক ওষুধ তৈরি করা হয়:- 

  1. ছত্রাকনাশক (Antifungal): যেমন কিটোকোনাজল (Ketoconazole) বা ক্লোট্রিমাজল। 
  2. অ্যান্টিবায়োটিক: মেট্রোনিডাজল (Metronidazole) যা পেটের সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। 
  3. ক্যান্সার ও রক্তচাপ: অনেক ক্যান্সার বিরোধী ওষুধ এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধে এই রিংটি একটি মূল উপাদান হিসেবে কাজ করে।

Share:

পিরিমিডিন রিং (Pyrimidine Ring)

পিরিমিডিন রিং (Pyrimidine Ring) হলো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ, যা আমাদের ডিএনএ (DNA) এবং আরএনএ (RNA)-এর গঠনগত ভিত্তি তৈরি করে। এটি একটি বিষমচক্রীয় (Heterocyclic) অ্যারোম্যাটিক বলয়। 

  রাসায়নিক গঠন: 



 পিরিমিডিন রিং হলো একটি ছয় সদস্য বিশিষ্ট একক বলয় (Single Ring Structure)। 

 এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: 

  1. এতে চারটি কার্বন (C) পরমাণু এবং দুটি নাইট্রোজেন (N) পরমাণু থাকে। 
  2. নাইট্রোজেন পরমাণু দুটি বলয়ের 1 নম্বর এবং 3 নম্বর অবস্থানে থাকে। 
  3. এর সাধারণ আণবিক সংকেত হলো C4H4N2। 

 নিউক্লিক অ্যাসিডে পিরিমিডিন:

আমাদের শরীরে জেনেটিক তথ্য বহনকারী নিউক্লিক অ্যাসিডে প্রধানত তিন ধরণের পিরিমিডিন বেস বা ক্ষারক পাওয়া যায়: 

  1. সাইটোসিন (Cytosine - C): এটি DNA এবং RNA উভয়ক্ষেত্রেই থাকে। 
  2. থাইমিন (Thymine - T): এটি শুধুমাত্র DNA-তে থাকে। 
  3. ইউরাসিল (Uracil - U): এটি শুধুমাত্র RNA-তে থাকে (থাইমিনের পরিবর্তে)। 
গুরুত্ব:

জেনেটিক কোড: পিরিমিডিন ক্ষারকগুলো হাইড্রোজেন বন্ধনীর মাধ্যমে পিউরিন ক্ষারকের সাথে যুক্ত হয়ে ডিএনএ-র দ্বি-তন্ত্রী গঠন তৈরি করে। (যেমন: C যুক্ত হয় G-এর সাথে, এবং T যুক্ত হয় A-এর সাথে) 

ওষুধ তৈরিতে: অনেক জীবনদায়ী ওষুধ (যেমন: অ্যান্টি-ভাইরাল বা অ্যান্টি-ক্যান্সার ড্রাগ) পিরিমিডিন রিং-এর গঠনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়।

Share:

রিচমন্ড-ল্যাং প্রভাব (Richmond–Lang Effect)

সাইটোকাইনিন হরমোনের প্রয়োগে উদ্ভিদের বার্ধক্য বা জরা (Senescence) পিছিয়ে দেওয়ার ঘটনাকেই রিচমন্ড-ল্যাং প্রভাব বলা হয়। 

উদ্ভিদের পাতা বা অন্যান্য অংশ সাধারণত সময়ের সাথে সাথে হলুদ হয়ে যায় এবং ঝরে পড়ে। এটি ঘটে যখন ক্লোরোফিল নষ্ট হয়ে যায় এবং প্রোটিন বা নিউক্লিক অ্যাসিডের ভাঙন শুরু হয়। কিন্তু যদি সেই পাতায় সাইটোকাইনিন প্রয়োগ করা হয়, তবে: 

  • ক্লোরোফিল নষ্ট হওয়ার গতি কমে যায়। 
  • পাতা অনেকদিন পর্যন্ত সবুজ ও সতেজ থাকে। 
  • প্রোটিন সংশ্লেষণ বজায় থাকে। 

এটি কীভাবে কাজ করে? 

    সাইটোকাইনিন হরমোন উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদানগুলোকে (যেমন- অ্যামিনো অ্যাসিড, খনিজ লবণ) পাতার দিকে টেনে আনে। একে বলা হয় 'Nutrient Mobilization'। যখন পাতায় পুষ্টির সরবরাহ ঠিক থাকে, তখন কোষের ক্ষয় রোধ হয় এবং বার্ধক্য দেরিতে আসে। 

কেন গুরুত্ব? 

  • শাকসবজি সংরক্ষণ: এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে শাকসবজি বা ফুল অনেকক্ষণ সতেজ রাখা সম্ভব হয়। 
  • ফলন বৃদ্ধি: পাতা দীর্ঘদিন সবুজ থাকলে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া সচল থাকে, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
  •  টিস্যু কালচার: গবেষণাগারে উদ্ভিদের অংশ সজীব রাখতে এটি ব্যবহার করা হয়।

 1. রিচমন্ড-ল্যাং প্রভাব কাকে বলে? 

উত্তর: সাইটোকাইনিন হরমোন প্রয়োগের ফলে উদ্ভিদের বার্ধক্য বা জরা (Senescence) বিলম্বিত হওয়ার এবং পাতা দীর্ঘক্ষণ সবুজ ও সতেজ থাকার ঘটনাকে রিচমন্ড-ল্যাং প্রভাব বলা হয়। ১৯৫৭ সালে বিজ্ঞানী রিচমন্ড এবং ল্যাং এটি লক্ষ্য করেন।

 2. কোন হরমোন রিচমন্ড-ল্যাং প্রভাব সৃষ্টিতে সাহায্য করে? 

উত্তর: সাইটোকাইনিন হরমোন। 

3. এই প্রভাবের ফলে উদ্ভিদে কী পরিবর্তন ঘটে? 

উত্তর: এই প্রভাবের ফলে পাতায় ক্লোরোফিল এবং প্রোটিনের ভাঙন রোধ হয়। ফলে পাতা সহজে হলুদ হয় না এবং অকালে ঝরে পড়ে না। 

4. কৃষিকাজ বা উদ্যানবিদ্যায় এই প্রভাবের একটি ব্যবহারিক গুরুত্ব লেখো। 

উত্তর: এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ফুলদানির ফুল বা বাজারজাত করার শাকসবজিকে দীর্ঘক্ষণ সতেজ ও সবুজ রাখা যায়।

Share:

আবদ্ধ অক্সিন(Bound Auxin)

Bound Auxin বা আবদ্ধ অক্সিন : 

"উদ্ভিদ কোষে যখন অক্সিন হরমোন বিভিন্ন জৈব অণুর সাথে যুক্ত হয়ে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় সঞ্চিত থাকে, তখন তাকে আবদ্ধ অক্সিন বলে। প্রয়োজনে এটি হাইড্রোলাইসিস প্রক্রিয়ায় মুক্ত অক্সিনে পরিণত হয়ে উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।"

 প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  1.  নিষ্ক্রিয় অবস্থা: আবদ্ধ অক্সিন ফিজিওলজিক্যালি বা শারীরবৃত্তীয়ভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে। অর্থাৎ, এটি সরাসরি কোষের বৃদ্ধিতে অংশ নিতে পারে না। কোষের বৃদ্ধির জন্য একে Free Auxin বা মুক্ত অক্সিনে রূপান্তরিত হতে হয়। 
  2. সঞ্চয় ভাণ্ডার: সাধারণত বীজ বা পরিণত পাতায় অক্সিন এভাবে জমা থাকে। যখন বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়, তখন এই আবদ্ধ অক্সিন মুক্ত হয়ে দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। 
  3. পরিবহন: অনেক সময় উদ্ভিদ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অক্সিন পাঠানোর জন্য একে শর্করার সাথে যুক্ত করে দেয়, যাতে এটি সহজে পরিবাহিত হতে পারে এবং নষ্ট না হয়। 
  4. সুরক্ষা: অক্সিন যখন অন্য অণুর সাথে যুক্ত থাকে, তখন এনজাইম (IAA-oxidase) একে সহজে ভেঙে ফেলতে পারে না। ফলে হরমোনটি সুরক্ষিত থাকে।

অক্সিন কনজুগেট (Auxin Conjugates):অক্সিন যখন অন্য অণুর(যেমন: শর্করা, অ্যামিনো অ্যাসিড বা প্রোটিন)সাথে যুক্ত হয়, তখন তাকে অক্সিন কনজুগেট (Auxin Conjugates) বলা হয়।


আবদ্ধ অক্সিনের রাসায়নিক ধরণ ও উদাহরণ

আবদ্ধ অক্সিনের ধরণ রাসায়নিক উদাহরণ (Example) উৎস / কোথায় পাওয়া যায়
এস্টার কনজুগেট IA-glucose (Indole-3-acetyl-glucose) ভুট্টা বা সিরিয়াল জাতীয় শস্যের বীজে।
অ্যামাইড কনজুগেট IA-aspartate বা IA-glutamate দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের (যেমন: মটর গাছ) চারা।
পলিস্যাকারাইড যুক্ত IA-inositol বা IA-glucan শস্যের এন্ডোস্পার্ম বা সস্য ভাণ্ডারে।
তুমি কি জানো?
ভুট্টার বীজে (Zea mays) প্রায় 95% অক্সিনই আবদ্ধ অবস্থায় থাকে। অঙ্কুরোদ্গমের সময় এটি দ্রুত মুক্ত অক্সিনে পরিণত হয়ে চারাগাছকে বাড়তে সাহায্য করে।
Share:

Agar Block (আগার ব্লক):

    Agar হলো সামুদ্রিক শৈবাল (red algae) থেকে পাওয়া জেলির মতো পদার্থ। এটি পানি শোষণ করে নরম জেল তৈরি করে। উদ্ভিদের রাসায়নিক পদার্থ সহজে এর মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে। 

হরমোন গবেষণায় এর ব্যবহারের প্রধান কারণগুলো হলো: 

ব্যাপন ক্ষমতা (Diffusion): আগার অত্যন্ত সচ্ছিদ্র। উদ্ভিদের ডগা যখন আগার ব্লকের ওপর রাখা হয়, তখন ডগার ভেতরে থাকা অক্সিন হরমোন খুব সহজেই ব্যাপন প্রক্রিয়ায় নিচের আগার ব্লকের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। 

সংরক্ষণ ক্ষমতা: এটি রাসায়নিক পদার্থকে নিজের ভেতরে ধরে রাখতে পারে। ডগা সরিয়ে নেওয়ার পরেও অক্সিন হরমোন আগার ব্লকের ভেতরে সক্রিয় অবস্থায় থাকে। 

জৈব নিষ্ক্রিয়তা: আগার নিজে উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে কোনো প্রভাব ফেলে না, এটি কেবল একটি মাধ্যম (Carrier) হিসেবে কাজ করে। 

ফ্রিটস ওয়েন্টের পরীক্ষায় আগার ব্লকের ভূমিকা ফ্রিটস ওয়েন্ট 1926 সালে আগার ব্লকের মাধ্যমেই প্রমাণ করেছিলেন যে অক্সিন একটি বস্তুগত পদার্থ (Material substance)। 

তাঁর পরীক্ষার ধাপগুলো ছিল নিম্নরূপ: 

 অক্সিন সংগ্রহ: ওট (Avena) উদ্ভিদের কোলীয়পটাইলের (Coleoptile )ডগা কেটে তিনি একটি আগার ব্লকের ওপর কয়েক ঘণ্টা রেখে দেন। ফলে ডগা থেকে অক্সিন আগার ব্লকে স্থানান্তরিত হয়।

 ডগাবিহীন কোলীয়পটাইলে স্থাপন: এরপর তিনি ডগাটি ফেলে দিয়ে শুধুমাত্র সেই 'অক্সিন সমৃদ্ধ' আগার ব্লকের টুকরোটি একটি ডগাবিহীন কোলীয়পটাইলের একপাশে স্থাপন করেন। 

ফলাফল: দেখা যায়, আগার ব্লকের প্রভাবে কোলীয়পটাইলটি হরমোনের আধিক্যের কারণে উল্টো দিকে বেঁকে যাচ্ছে। 


পরীক্ষায় ছাত্রছাত্রীরা প্রায়ই বয়েসেন-জেনসেনের জিলেটিন এবং ওয়েন্টের আগার এর মধ্যে গুলিয়ে ফেলে। তাদের জন্য এই পয়েন্টটি মনে রাখা জরুরি: জিলেটিন: বয়েসেন-জেনসেন ডগা ও কাণ্ডের মাঝে একটি 'সেতু' হিসেবে জিলেটিন ব্যবহার করেছিলেন। আগার: ফ্রিটস ওয়েন্ট হরমোনটিকে ডগা থেকে আলাদা করে বের করে আনার (Extract) মাধ্যম হিসেবে আগার ব্যবহার করেছিলেন।

Share:

অক্সিন আবিষ্কারের ইতিহাস

    1880 সালে আধুনিক বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন (Charles Darwin) এবং তাঁর পুত্র ফ্রান্সিস ডারউইন উদ্ভিদ হরমোন গবেষণার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তাঁরা লক্ষ্য করেছিলেন যে, ক্যানারি ঘাসের (Canary grass) ভ্রূণমুকুলাবরণী বা Coleoptile একপাশ থেকে আলো পেলে সেই আলোর উৎসের দিকে বেঁকে যায়। 

এই রহস্য উন্মোচনের জন্য তাঁরা কয়েকটি ধাপে পরীক্ষাটি করেন

ডারউইন Coleoptile ওপর চারটি ভিন্ন অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন: 

  1. স্বাভাবিক অবস্থা (Control): একটি সাধারণ কোলীয়পটাইলে একপাশ থেকে আলো দেওয়া হলো। ফলাফল: এটি আলোর দিকে বেঁকে গেল। 
  2.  ডগা কেটে ফেলা (Decapitated): কোলীয়পটাইলের ডগাটি কেটে বাদ দেওয়া হলো। ফলাফল: উদ্ভিদটি আর আলোর দিকে বেঁকল না বা বৃদ্ধি পেল না। 
  3.  অস্বচ্ছ টুপি (Opaque Cap): কোলীয়পটাইলের ডগাটি একটি আলো-অভেদ্য (অস্বচ্ছ) টুপি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। ফলাফল: এটি আলোর দিকে বেঁকল না। 
  4.  স্বচ্ছ টুপি (Transparent Cap): ডগাটি একটি স্বচ্ছ কাঁচের টুপি দিয়ে ঢাকা হলো। ফলাফল: এটি স্বাভাবিকভাবেই আলোর দিকে বেঁকে গেল। 
  5.  নিচের অংশ ঢাকা (Base Covered): ডগাটি খোলা রেখে নিচের অংশটি একটি অস্বচ্ছ আবরণ দিয়ে ঢাকা হলো। ফলাফল: উদ্ভিদটি তবুও আলোর দিকে বেঁকে গেল। 
ডারউইনের সিদ্ধান্ত এই পরীক্ষার মাধ্যমে ডারউইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্তে পৌঁছান: 

  1. সংবেদনশীল অঞ্চল: কোলীয়পটাইলের ডগা (Tip) হলো আলোক সংবেদনশীল অংশ। অর্থাৎ ডগাই আলো শনাক্ত করে। 
  2. সংকেত প্রবাহ: আলো শনাক্ত হয় ডগায়, কিন্তু বেঁকে যাওয়ার ঘটনাটি ঘটে ডগার কিছুটা নিচে। এর থেকে ডারউইন বুঝতে পারেন যে, ডগা থেকে কোনো এক ধরণের "প্রভাব" (Influence) বা সংকেত নিচের দিকে প্রবাহিত হয় যা উদ্ভিদকে বাঁকতে সাহায্য করে। 
ডারউইন যদিও জানতেন না যে এই "প্রভাব" আসলে একটি রাসায়নিক হরমোন (অক্সিন), তবুও তাঁর এই পরীক্ষাই পরবর্তীকালে বয়েসেন-জেনসেন এবং ফ্রিটস ওয়েন্ট-এর মতো বিজ্ঞানীদের গবেষণার পথ প্রশস্ত করেছিল।


পিটার বয়েসেন-জেনসেন (Peter Boysen-Jensen) 1913 সালে উদ্ভিদের আলোকবৃত্তি (Phototropism) বা আলোর দিকে বেঁকে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে একটি যুগান্তকারী পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। চার্লস ডারউইনের গবেষণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে, উদ্ভিদের কাণ্ডের ডগা থেকে এক ধরণের রাসায়নিক সংকেত নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। 

 ডারউইন লক্ষ্য করেছিলেন যে, ঘাসজাতীয় উদ্ভিদের ভ্রূণমুকুলাবরণী বা কোলীয়পটাইল (Coleoptile)-এর ডগা আলোর উৎস শনাক্ত করে, কিন্তু বাঁকার প্রক্রিয়াটি ঘটে ডগার কিছুটা নিচে। বয়েসেন-জেনসেন বুঝতে চেয়েছিলেন এই সংকেতটি কীভাবে নিচে পৌঁছায়। 

পরীক্ষার ধাপ ও পর্যবেক্ষণ 

তিনি কোলীয়পটাইলকে((Coleoptile) দুটি ভিন্ন উপাদানের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন: 

 জিলেটিন (Gelatin) ব্লক ব্যবহার

তিনি কোলীয়পটাইলের (Coleoptile) ডগাটি কেটে ফেলেন এবং ডগা ও অবশিষ্টাংশের মাঝে এক টুকরো জিলেটিন (জিলেটিন এমন একটি পদার্থ যা জলের মতো দ্রবণীয় রাসায়নিক পদার্থকে নিজের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে দেয়।)বসিয়ে দেন। 

ফলাফল: দেখা গেল উদ্ভিদটি এখনও আলোর দিকে বেঁকে যাচ্ছে। 

সিদ্ধান্ত: যেহেতু জিলেটিন একটি জল-দ্রবণীয় এবং সচ্ছিদ্র পদার্থ, তাই এটি প্রমাণ করে যে ডগা থেকে আসা সংকেতটি একটি রাসায়নিক পদার্থ, যা জিলেটিনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।  

মাইকা (Mica) বা অভ্র পাত ব্যবহার: 

তিনি কোলীয়পটাইলের একপাশে একটি অভ্রের পাত (যা কোনো তরল বা রাসায়নিক পদার্থ চলাচলে বাধা দেয়) প্রবেশ করান। 

অন্ধকার দিকে মাইকা: যখন মাইকা পাতটি অন্ধকারের দিকে (আলোর বিপরীত দিকে) ঢোকানো হলো, তখন উদ্ভিদটি আলোর দিকে বেঁকে যেতে পারল না। 

আলোকের দিকে মাইকা: যখন পাতটি আলোর দিকে ঢোকানো হলো, তখন উদ্ভিদটি স্বাভাবিকভাবেই আলোর দিকে বেঁকে গেল।

বয়েসেন-জেনসেনের পরীক্ষার মাধ্যমে দুটি প্রধান সত্য উন্মোচিত হয়: 

রাসায়নিক প্রকৃতি: উদ্ভিদের এই সংকেতটি কোনো বৈদ্যুতিক প্রবাহ নয়, বরং একটি রাসায়নিক উপাদান (যা পরবর্তীতে অক্সিন হিসেবে চিহ্নিত হয়)। 

প্রবাহের দিক: আলোর প্রভাবে এই রাসায়নিক পদার্থটি উদ্ভিদের অন্ধকার বা ছায়াযুক্ত পাশে জমা হয় এবং সেখান দিয়েই নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এই পাশের কোষগুলো বেশি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার ফলেই উদ্ভিদটি আলোর দিকে বেঁকে যায়।

 বিজ্ঞানে এর গুরুত্ব বয়েসেন-জেনসেনের এই 'পারমিবিলিটি টেস্ট' বা ভেদ্যতা পরীক্ষা উদ্ভিদ হরমোন গবেষণায় বিপ্লব ঘটিয়েছিল। তাঁর এই কাজের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে 1926 সালে বিজ্ঞানী ফ্রিটস ওয়েন্ট (Frits Went) সফলভাবে অক্সিন হরমোন পৃথক করতে সক্ষম হন।


    1919 সালে হাঙ্গেরীয় উদ্ভিদবিজ্ঞানী আর্পাদ পাল (Arpad Paal) বয়েসেন-জেনসেনের পরীক্ষার ফলাফলকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি পরীক্ষা পরিচালনা করেন। তাঁর এই পরীক্ষাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, আলোর অনুপস্থিতিতেও উদ্ভিদের একদিকের কোষের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটিয়ে উদ্ভিদকে বাঁকানো সম্ভব। 


পরীক্ষার ধাপ:

  • অন্ধকারে পরীক্ষা: পাল তাঁর সম্পূর্ণ পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে সম্পন্ন করেন যাতে আলোর কোনো প্রভাব না থাকে। 
  • ডগা কাটা: তিনি একটি ওট (Avena) কোলীয়পটাইলের ডগা কেটে ফেলেন।
  • অপ্রতিসম স্থাপন (Asymmetrical Placement): তিনি কাটা ডগাটিকে পুনরায় কোলীয়পটাইলের ওপর বসান, কিন্তু ঠিক মাঝখানে নয়। তিনি ডগাটিকে কাটা অংশের একপাশে (ধরা যাক বাম পাশে) একটু সরিয়ে স্থাপন করেন। 

পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল:

 পর্যবেক্ষণ: দেখা গেল যে, ডগাটি যে পাশে বসানো হয়েছিল (বাম পাশে), তার বিপরীত দিকে (ডান পাশে) উদ্ভিদটি বেঁকে গেল। 

ফলাফল: ডগা থেকে কোনো একটি পদার্থ (যা আমরা এখন অক্সিন বলে জানি) ডগার ঠিক নিচের অংশে প্রবেশ করে এবং সেই পাশের কোষগুলোর দ্রুত বৃদ্ধি ঘটায়। ফলে অন্য পাশে কোষের বৃদ্ধি কম হওয়ায় উদ্ভিদটি বেঁকে যায়।


পালের পরীক্ষার গুরুত্ব ও সিদ্ধান্ত 

পালের পরীক্ষাটি উদ্ভিদবিজ্ঞানে দুটি বড় সত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল:

  •  আলো ছাড়াই বাঁকানো সম্ভব: ডারউইন বা বয়েসেন-জেনসেন আলোর প্রভাবে বাঁকার বিষয়টি দেখেছিলেন। কিন্তু পাল প্রমাণ করেন যে, আলোর অনুপস্থিতিতেও যদি ডগা থেকে আসা রাসায়নিক পদার্থটি একপাশে বেশি পরিমাণে পৌঁছায়, তবে উদ্ভিদটি বেঁকে যাবে। 
  • অসম বৃদ্ধি (Differential Growth): তিনি প্রথম পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, কোলীয়পটাইলের বাঁকা ভাব মূলত দুই পাশের কোষের অসম বৃদ্ধির ফলেই ঘটে। হরমোন যে পাশে বেশি থাকে, সেই পাশের বৃদ্ধি দ্রুত হয়।


    1926 সালে ওলন্দাজ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ফ্রিটস ওয়েন্ট (Frits Went) পিটার বয়েসেন-জেনসেনের গবেষণাকে পূর্ণতা দান করেন। তিনি প্রথমবার উদ্ভিদের ডগা থেকে সেই রহস্যময় রাসায়নিক পদার্থটিকে পৃথক করতে সক্ষম হন এবং এর নাম দেন "অক্সিন" (Auxin)। 

পরীক্ষার ধাপসমূহ: 

ওয়েন্ট তাঁর পরীক্ষার জন্য ওট (Avena) উদ্ভিদের ভ্রূণমুকুলাবরণী বা কোলীয়পটাইল ব্যবহার করেছিলেন। 

ডগা পৃথকীকরণ: তিনি প্রথমে কোলীয়পটাইলের ডগাটি কেটে আলাদা করেন। 

আগার ব্লকে স্থাপন: কাটা ডগাগুলোকে তিনি কয়েক ঘণ্টার জন্য আগার (Agar) নামক এক ধরণের জেলির ব্লকের ওপর রেখে দেন। তিনি ধারণা করেছিলেন যে ডগার রাসায়নিক পদার্থটি আগার ব্লকে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে। 

ডগাবিহীন কোলীয়পটাইলে স্থাপন: এরপর তিনি ডগাগুলো সরিয়ে ফেলেন এবং শুধুমাত্র সেই আগার ব্লকের ছোট টুকরো নিয়ে ডগাবিহীন কোলীয়পটাইলের ওপর স্থাপন করেন। 

পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল ওয়েন্ট আগার ব্লকের টুকরোগুলোকে দুইভাবে স্থাপন করে ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল লক্ষ্য করেন: 

  • মাঝখানে স্থাপন: আগার ব্লকটি কোলীয়পটাইলের ঠিক মাঝখানে রাখলে উদ্ভিদটি সোজাভাবে বৃদ্ধি পায়। 
  • একপাশে (অপ্রতিসম) স্থাপন: যখন তিনি আগার ব্লকের টুকরোটি কাটা অংশের একপাশে (ধরা যাক বাম পাশে) স্থাপন করলেন, তখন দেখা গেল উদ্ভিদটি বিপরীত দিকে (ডান পাশে) বেঁকে যাচ্ছে, যদিও সেখানে কোনো আলো ছিল না। 

গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত 

  •  অক্সিনের আবিষ্কার: ওয়েন্ট প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদের বৃদ্ধি একটি রাসায়নিক পদার্থের ওপর নির্ভরশীল। তিনি এই পদার্থের নাম দেন অক্সিন, যা গ্রিক শব্দ 'Auxein' (বৃদ্ধি পাওয়া) থেকে এসেছে। 
  •  অসম বৃদ্ধি (Unequal Growth): তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, কোলীয়পটাইলের যে পাশে অক্সিন বেশি থাকে, সেই পাশের কোষগুলো দ্রুত বিভাজিত ও দীর্ঘায়িত হয়। ফলে কম অক্সিন থাকা পাশের দিকে উদ্ভিদটি বেঁকে যায়। 
  •  আলোকবৃত্তির কারণ: তিনি নিশ্চিত করেন যে, আলো যখন একপাশ থেকে আসে, তখন অক্সিন অন্ধকার দিকে সরে যায়, ফলে অন্ধকার পাশের কোষগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং উদ্ভিদটি আলোর দিকে বেঁকে যায়।


Share:

অক্সিন (Auxin)

 

অক্সিন (Auxin): উদ্ভিদের কান্ড ও মূলের অগ্রভাগ(Shoot Apex, Root apex), ভ্রূণমুকুলাবরণী (Coleoptile- কোলিওপটাইল) এবং কচি পাতা থেকে উৎপন্ন যে নাইট্রোজেনঘটিত জৈব অ্যাসিড উদ্ভিদের কোষ বিভাজন ও কোশের আয়তন বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে এবং উদ্ভিদের ট্রপিক চলন নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে অক্সিন বলে।


অক্সিনের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ 

  1. রাসায়নিক উপাদান: এটি মূলত কার্বন (C), হাইড্রোজেন (H), অক্সিজেন (O) এবং নাইট্রোজেন (N) দিয়ে গঠিত।
  2.  রাসায়নিক প্রকৃতি: এটি একটি জৈব অ্যাসিড (প্রধানত ইন্ডোল গ্রুপ যুক্ত)। 
  3. অধিকাংশ উদ্ভিদে অক্সিন তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো ট্রিপটোফ্যান (Tryptophan) নামক একটি অ্যামিনো অ্যাসিড। 
  4. অক্সিন সংশ্লেষণের জন্য জিঙ্ক (Zn) খনিজটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। জিঙ্কের অভাব হলে উদ্ভিদে অক্সিন তৈরি ব্যাহত হয়, ফলে গাছের বৃদ্ধি কমে যায় এবং পাতা ছোট হয়ে যায় (যাকে 'Little Leaf' রোগ বলে)। 
  5. উৎসস্থল থেকে অক্সিন সাধারণত মেরুশর্তী বা পোলার ট্রান্সপোর্ট (Polar Transport) পদ্ধতিতে অর্থাৎ উপর থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়।


অক্সিন (Auxin) হরমোনকে তাদের উৎস এবং রাসায়নিক প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: প্রাকৃতিক অক্সিন এবং কৃত্রিম অক্সিন। 

প্রাকৃতিক অক্সিন (Natural Auxin): প্রাকৃতিক অক্সিন হলো উদ্ভিদদেহে প্রাকৃতিকভাবে সংশ্লেষিত এক প্রকার নাইট্রোজেনঘটিত জৈব অ্যাসিড, যা উদ্ভিদের বর্ধনশীল অংশ যেমন— কান্ড ও মূলের অগ্রভাগ, কচি পাতা এবং ভ্রূণমুকুলাবরণী থেকে উৎপন্ন হয়ে কোষের বিভাজন ও আয়তন বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে।

 কৃত্রিম অক্সিন (Synthetic Auxin): উদ্ভিদদেহে উৎপন্ন প্রাকৃতিক অক্সিন হরমোনের গঠন অনুকরণে গবেষণাগারে যে সমস্ত নাইট্রোজেনঘটিত জৈব অ্যাসিড সংশ্লেষণ করা হয়েছে এবং যা উদ্ভিদের ট্রপিক চলন, অকাল ফল ঝরা রোধ ও কোষ বিভাজনে সাহায্য করে, তাদের কৃত্রিম অক্সিন বলে।

প্রাকৃতিক অক্সিনের প্রধান উৎসসমূহ (Major Sources) 

  1. ভ্রূণমুকুলাবরণী (Coleoptile- কোলিওপটাইল): এটি অক্সিনের অন্যতম প্রধান উৎস। চারার প্রাথমিক বৃদ্ধির সময় এটি প্রচুর পরিমাণে অক্সিন সরবরাহ করে। 
  2. কাণ্ডের অগ্রভাগ (Stem Apex/shoot apex): কাণ্ডের একদম ডগায় থাকা ভাজক কলা বা meristematic টিস্যুতে অক্সিন সংশ্লেষিত হয়। এটি উদ্ভিদের লম্বায় বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করে।
  3.  মূলের অগ্রভাগ (Root Apex): কাণ্ডের মতো মূলের একদম অগ্রভাগেও সামান্য পরিমাণে অক্সিন উৎপন্ন হয় যা মূলের চলন ও বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
  4.  কচি পাতা (Young Leaves): নতুন জন্মানো কচি পাতা অক্সিনের একটি সক্রিয় উৎস। এখান থেকে অক্সিন উদ্ভিদের নিচের দিকে পরিবাহিত হয়। 
  5. বর্ধনশীল রেণু ও ভ্রূণ: উদ্ভিদের প্রজনন অঙ্গের বর্ধনশীল অংশ এবং বিকাশমান বীজের ভ্রূণ থেকেও অক্সিন নিঃসৃত হয়।


প্রাকৃতিক অক্সিন (Natural Auxin) এবং কৃত্রিম অক্সিন (Synthetic Auxin)-এর মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

বৈশিষ্ট্য প্রাকৃতিক অক্সিন (Natural Auxin) কৃত্রিম অক্সিন (Synthetic Auxin)
উৎস এগুলি উদ্ভিদদেহে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়। এগুলি গবেষণাগারে রাসায়নিকভাবে তৈরি করা হয়।
স্থিতিশীলতা এগুলি তুলনামূলক কম স্থিতিশীল এবং উদ্ভিদের এনজাইম (IAA Oxidase) দ্বারা দ্রুত ভেঙে যায়। এগুলি অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং উদ্ভিদের কোষে দীর্ঘক্ষণ সক্রিয় থাকে।
পরিবহন এগুলি সর্বদা উদ্ভিদের অগ্রভাগ থেকে নিচের দিকে (Polar Transport) পরিবাহিত হয়। এগুলি উদ্ভিদের সব দিকে বা যেকোনো অভিমুখে পরিবাহিত হতে পারে।
খরচ উদ্ভিদ থেকে এগুলি নিষ্কাশন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এগুলি ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য।
ব্যবহার মূলত উদ্ভিদের অভ্যন্তরীণ জৈবিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। কৃষিকাজ, আগাছা দমন এবং বাণিজ্যিক উদ্যানপালনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ IAA (Indole-3-acetic acid), IBA (Indole-3-butyric acid), PAA(ফিনাইলঅ্যাসেটিক অ্যাসিড), 4 ক্লোরো ইনডোল অ্যাসিটিক অ্যাসিড(4-Cl-IAA) NAA - ন্যাফথালিন অ্যাসিটিক অ্যাসিড, 2,4-Dichlorophenoxyacetic acid, 2-4-5-T (2-4-5-Trichlorophenoxyacetic acid),  IBA

Bound Auxin বা আবদ্ধ অক্সিন: "উদ্ভিদ কোষে যখন অক্সিন হরমোন বিভিন্ন জৈব অণুর সাথে যুক্ত হয়ে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় সঞ্চিত থাকে, তখন তাকে আবদ্ধ অক্সিন বলে। প্রয়োজনে এটি হাইড্রোলাইসিস প্রক্রিয়ায় মুক্ত অক্সিনে পরিণত হয়ে উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।"

Share:

2-4-5-ট্রাইক্লোরোফেনক্সি অ্যাসিটিক অ্যাসিড

    2,4,5-T (2,4,5-Trichlorophenoxyacetic acid) 2-4-5-ট্রাইক্লোরোফেনক্সি অ্যাসিটিক অ্যাসিড হলো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিতর্কিত কৃত্রিম অক্সিন হরমোন। এটি প্রধানত কাঠের মতো শক্ত কান্ডবিশিষ্ট আগাছা এবং জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য আগাছানাশক (Herbicide) হিসেবে ব্যবহৃত হতো।


রাসায়নিক গঠন ও প্রকৃতি:

 এটি 2,4-D (2,4-ডাইক্লোরোফেনক্সি অ্যাসিটিক অ্যাসিড)-এর সাথে গঠনগতভাবে খুব মিল সম্পন্ন, তবে এতে একটি অতিরিক্ত ক্লোরিন পরমাণু থাকে। 

  • এটি একটি ক্লোরিনযুক্ত ফেনোক্সি যৌগ। 
  •  একটি benzene ring (phenoxy group) থাকে এতে 2, 4 এবং 5 নম্বর অবস্থানে তিনটি ক্লোরিন পরমাণু যুক্ত থাকে 
  •  এর সাথে একটি –CH₂–COOH (acetic acid group) যুক্ত 
  • এর রাসায়নিক সংকেত হলো C8H5Cl3O3



প্রধান কাজ ও ব্যবহার শক্ত আগাছা দমন: 

এটি সাধারণ আগাছানাশকের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। এটি মূলত ঝোপঝাড় এবং বড় বড় কাঠের মতো গাছ (Woody plants) ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয়। 

 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: 

 2,4,5-T তৈরির সময় উপজাত (By-product) হিসেবে TCDD নামক একটি অত্যন্ত বিষাক্ত ডাইঅক্সিন (Dioxin) তৈরি হয়। এটি মানুষের শরীরে ক্যানসার, জন্মগত ত্রুটি এবং ভয়াবহ চর্মরোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণে বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশে (ভারত সহ) 2,4,5-T (2,4,5-Trichlorophenoxyacetic acid) নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কৃষিকাজে এখন এর পরিবর্তে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে 2,4-D(2,4-ডাইক্লোরোফেনক্সি অ্যাসিটিক অ্যাসিড) বা অন্যান্য আধুনিক হার্বিসাইড ব্যবহার করা হয়।

Share:

2,4-ডাইক্লোরোফেনক্সি অ্যাসিটিক অ্যাসিড(2,4-D)

2,4-D (2,4-Dichlorophenoxyacetic acid) 2,4-ডাইক্লোরোফেনক্সি অ্যাসিটিক অ্যাসিড হলো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বহুল ব্যবহৃত কৃত্রিম অক্সিন হরমোন, যা মূলত আগাছানাশক (Weedicide/Herbicide) হিসেবে পরিচিত। এটি মূলত প্রাকৃতিক অক্সিন হরমোনের (IAA) একটি কৃত্রিম বিকল্প, যা উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিকভাবে ত্বরান্বিত করে তাকে ধ্বংস করে ফেলে।


রাসায়নিক গঠন ও প্রকৃতি:

  1.  এটি একটি ক্লোরিনযুক্ত ফেনোক্সি যৌগ।  
  2. একটি benzene ring (phenoxy group) থাকে 
  3.  এতে 2 ও 4 নম্বর অবস্থানে Cl (chlorine) যুক্ত এর সাথে একটি –CH₂–COOH (acetic acid group) যুক্ত। 
  4. এর রাসায়নিক সংকেত হলো C8H6Cl2O3




প্রধান কাজ ও ব্যবহার

আগাছানাশক হিসেবে: এটি মূলত দ্বিবীজপত্রী (Dicot) আগাছা দমনে ব্যবহৃত হয়। ধান, গম বা ভুট্টার মতো একবীজপত্রী শস্যক্ষেত্রে যখন দ্বিবীজপত্রী আগাছা জন্মায়, তখন এটি স্প্রে করলে শস্যের ক্ষতি না করে কেবল আগাছাগুলো মারা যায়। এটি একটি সিলেক্টিভ হার্বিসাইড; অর্থাৎ এটি নির্দিষ্ট ধরণের উদ্ভিদকে (দ্বিবীজপত্রী) লক্ষ্য করে কাজ করে। 

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: 'এজেন্ট অরেঞ্জ' (Agent Orange) ভিয়েতনামের যুদ্ধে ব্যবহৃত কুখ্যাত 'এজেন্ট অরেঞ্জ' নামক রাসায়নিক মিশ্রণটির অর্ধেক উপাদান ছিল এই 2,4-D (বাকি অর্ধেক ছিল 2,4,5-T)। এটি জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য ব্যাপকভাবে আকাশ থেকে ছিটানো হয়েছিল।

Share:

NAA - ন্যাফথালিন অ্যাসিটিক অ্যাসিড

    NAA - ন্যাফথালিন অ্যাসিটিক অ্যাসিড (Naphthaleneacetic acid) হলো একটি কৃত্রিম উদ্ভিদ হরমোন যা 'অক্সিন' (Auxin) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এটি কৃষিকাজ এবং উদ্যানপালনে (Horticulture) ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। প্রাকৃতিক অক্সিন (Indole-3-acetic acid (IAA)) খুব দ্রুত আলো বা এনজাইমের প্রভাবে নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু NAA অনেক বেশি স্থিতিশীল (Stable)। এটি অনেকক্ষণ উদ্ভিদের টিস্যুতে কার্যকর থাকে এবং সহজে ভেঙে যায় না।


রাসায়নিক গঠন (Chemical Structure):

 NAA হলো একটি সিন্থেটিক বা কৃত্রিম অক্সিন। এর গঠন মূলত দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত:

  1.  ন্যাপথলিন রিং (Naphthalene Ring): এর কেন্দ্রে দুটি বেনজিন রিং যুক্ত থাকে, যাকে ন্যাপথলিন নিউক্লিয়াস বলা হয়। ন্যাপথলিন রিং থাকার কারণে এটি উদ্ভিদের পাতার মোমের আস্তরণ (Cuticle) ভেদ করে সহজে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। 
  2. অ্যাসিটিক অ্যাসিড গ্রুপ (Acetic Acid Group): ন্যাপথলিন রিং-এর ১ নম্বর কার্বন অবস্থানের সাথে একটি অ্যাসিটিক অ্যাসিড পার্শ্বশৃঙ্খল (Side chain) যুক্ত থাকে। এই অ্যাসিডিক গ্রুপটি উদ্ভিদের কোষের রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয়ে কোষ বিভাজনের সংকেত পাঠায়। রাসায়নিক সংকেত: C12H10O2



প্রধান কাজ ও ব্যবহার (Main Functions & Uses)

  •  শিকড় গজানো (Rooting Agent): কলম বা কাটিং থেকে নতুন চারা তৈরির সময় এটি ব্যবহার করা হয়। ডালের গোড়ায় NAA প্রয়োগ করলে খুব দ্রুত এবং শক্তিশালী শিকড় গজায়। 
  • অকাল ফল ঝরা রোধ (Prevents Fruit Drop): আম, লেবু, লিচু বা আপেলের মতো ফল পাকার আগেই ঝরে পড়া রোধ করতে এটি গাছে স্প্রে করা হয়। 
  • ফলের আকার বৃদ্ধি (Fruit Thinning and Growth): অনেক সময় গাছে অতিরিক্ত ফল আসলে কিছু ফল ঝরিয়ে দিয়ে বাকিগুলোর আকার বড় এবং মানসম্মত করতে এটি সাহায্য করে। 
  • ফুলের সংখ্যা বৃদ্ধি (Flowering): এটি উদ্ভিদে স্ত্রী ও পুরুষ ফুলের অনুপাত পরিবর্তন করতে এবং তাড়াতাড়ি ফুল আনতে সাহায্য করে (যেমন: শসা বা কুমড়ো জাতীয় ফসলে) 
  • টিস্যু কালচার (Tissue Culture): গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে চারা তৈরির সময় কোষ বিভাজন এবং শিকড় তৈরির জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।

Share:

4-ক্লোরো-ইনডোল-3-অ্যাসিটিক অ্যাসিড

   4-ক্লোরো-ইনডোল--অ্যাসিটিক অ্যাসিড (4-Cl-IAA) হলো প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন এক ধরণের শক্তিশালী অক্সিন, যা সাধারণত মটর (Pea), শিম (Broad bean) এবং অন্যান্য লেগুমিনাস (Leguminous) উদ্ভিদে পাওয়া যায়। এটি সাধারণ অক্সিন (IAA)-এর একটি ক্লোরিনেটেড সংস্করণ।

রাসায়নিক গঠন প্রকৃতি

এটি সাধারণ IAA-এর মতোই ইন্ডোল--অ্যাসিটিক অ্যাসিড, তবে এর ইন্ডোল বলয়ের 4 নম্বর অবস্থানে একটি ক্লোরিন (Cl) পরমাণু যুক্ত থাকে।

  • আণবিক সংকেত: C_10H_8ClNO_2
  • বৈশিষ্ট্য: ক্লোরিন পরমাণুর উপস্থিতির কারণে এটি সাধারণ IAA-এর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর এবং স্থিতিশীল।

 কেন এটি সাধারণ IAA থেকে আলাদা?

  • অধিক কার্যকারিতা: গবেষণায় দেখা গেছে যে, নির্দিষ্ট কিছু কাজের ক্ষেত্রে (যেমনকোষের প্রসারণ) এটি সাধারণ IAA-এর তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী হতে পারে।
  • প্রতিরোধ ক্ষমতা: উদ্ভিদের ভেতরে অক্সিন ধ্বংসকারী এনজাইমগুলো (যেমন—IAA oxidase) একে সহজে ভাঙতে পারে না, কারণ ক্লোরিন পরমাণু একে সুরক্ষা দেয়।

প্রধান কাজসমূহ

 ফলের বৃদ্ধি: মটরশুঁটির বীজের বিকাশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বীজ থেকে ডিম্বাশয়ে সংকেত পাঠায় যাতে ফলটি পুষ্ট হয়।

অকাল পতন রোধ: ফল বা পাতা যাতে সময়ের আগেই ঝরে না পড়ে, তাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রোটিন সংশ্লেষণ: এটি কোষে RNA এবং প্রোটিন সংশ্লেষণ ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে সাধারণ অক্সিনের চেয়ে বেশি সক্রিয়।


উৎস

এটি মূলত উদ্ভিদের কচি ফল এবং বীজে বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে মটর (Pisum sativum) এবং ল্যাথাইরাস (Lathyrus) গণভুক্ত উদ্ভিদগুলোতে এর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে।

Share:

PAA-ফিনাইলঅ্যাসেটিক অ্যাসিড

 

 

ফিনাইলঅ্যাসেটিক অ্যাসিড non-indole auxin (IAA-এর মতো indole ring নেই),উদ্ভিদে স্বাভাবিকভাবেই অল্প পরিমাণে থাকে ,ধীরে কাজ করে কিন্তু স্থায়ী প্রভাব রাখতে পারে.

এটি মূলত অ্যামাইনো অ্যাসিড ফিনাইলঅ্যালানিন (Phenylalanine) থেকে সংশ্লেষিত হয়।

IAA যেমন একটি নির্দিষ্ট দিকে (ওপর থেকে নিচে) চলাচল করে, PAA সেভাবে চলে না। এটি উদ্ভিদের সংবহন কলার (Vascular tissue) মাধ্যমে সব দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

PAA-এর একটি বিশেষ গুণ হলো এর অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল (Anti-microbial) ক্ষমতা। এটি উদ্ভিদকে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ছত্রাক থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

কেন PAA গুরুত্বপূর্ণ?

গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতিকূল পরিবেশে যখন IAA-এর মাত্রা কমে যায় বা IAA ভেঙে যায়, তখন PAA উদ্ভিদের বৃদ্ধি বজায় রাখতে বিকল্প অক্সিন হিসেবে কাজ করে। এটি মূলত উদ্ভিদের একটি ব্যাকআপ সিস্টেমের মতো কাজ করে

Share:

IBA (Indole-3-butyric acid)

 

IBA (Indole-3-butyric acid) হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ auxin (উদ্ভিদ হরমোন), যা উদ্ভিদের বৃদ্ধি বিশেষ করে root formation (মূল গঠন)- বড় ভূমিকা রাখে।

IBA বা Indole-3-Butyric Acid হলো একটি শক্তিশালী এবং বহুল ব্যবহৃত অক্সিন হরমোন। এটি প্রাকৃতিক কৃত্রিম উভয় ভাবেই পাওয়া যায়, তবে কৃষিক্ষেত্রে কৃত্রিম IBA-এর প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি। এটি IAA-এর তুলনায় অধিক স্থিতিশীল, কারণ উদ্ভিদের ভেতরের এনজাইমগুলো একে সহজে ভেঙে ফেলতে পারে না।

প্রাকৃতিক অক্সিন (IAA) থাকার পরেও বিজ্ঞানীরা কেন IBA-কে প্রাধান্য দেন?

 স্থায়িত্ব: IAA আলোতে বা এনজাইমের প্রভাবে খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু IBA দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকে।

 পরিবহন: IBA কোষে খুব একটা চলাচল করে না (Non-polar transport), ফলে এটি যেখানে প্রয়োগ করা হয় ঠিক সেখানেই মূল গজাতে সাহায্য করে।

কার্যকারিতা: এটি সব ধরণের উদ্ভিদে (যেমনফুল গাছ, ফলের গাছ বা ক্যাকটাস) সমানভাবে কাজ করে।

 

Share:

ইন্ডোল-৩-পাইরুভিক অ্যাসিড (IPA) পথ

ইন্ডোল-3পাইরুভিক অ্যাসিড (IPA) পথ: এটি উদ্ভিদের প্রধান অক্সিন সংশ্লেষণ পথ। এটি দুটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হয়:

অ্যামিনো ট্র্যান্সফার (Aminotransfer): প্রথমে TAA1 নামক এনজাইমের উপস্থিতিতে L-Tryptophan তার অ্যামিনো গ্রুপ হারায় এবং Indole-3-Pyruvic Acid (IPA)- পরিণত হয়।

ডিকার্বক্সিলেশন (Decarboxylation): এরপর YUCCA নামক এক ধরণের এনজাইম (Flavin monooxygenase) IPA-কে সরাসরি IAA-তে রূপান্তরিত করে।

 


অন্যান্য সম্ভাব্য পথ (Alternative Pathways) 

উদ্ভিদের প্রজাতি এবং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আরও কিছু পথে IAA তৈরি হতে পারে:

  •  TAM (Tryptamine) পথ: এখানে ট্রিপটোফ্যান প্রথমে ডিকার্বক্সিলেশন প্রক্রিয়ায় ট্রিপটামাইন (Tryptamine) তৈরি করে, যা পরে জারিত হয়ে IAA উৎপন্ন করে।
  •  IAN (Indole-3-Acetonitrile) পথ: কিছু নির্দিষ্ট উদ্ভিদ পরিবারে (যেমন: ব্রাসিকেসি) ট্রিপটোফ্যান থেকে প্রথমে ইন্ডোল-৩-অ্যাসিট্যালডক্সিম এবং পরে ইন্ডোল-৩-অ্যাসিটোনাইট্রাইল (IAN) তৈরি হয়। সবশেষে নাইট্রিলেজ এনজাইমের সাহায্যে এটি IAA-তে পরিণত হয়।
  •  IAM (Indole-3-Acetamide) পথ: এটি মূলত উদ্ভিদে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়, তবে কিছু উদ্ভিদেও এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

Share:

Acid Growth Hypothesis

 



Acid Growth Hypothesis হলো এমন একটি তত্ত্ব যা ব্যাখ্যা করে কীভাবে উদ্ভিদ হরমোন অক্সিন (প্রধানত IAA) কোষ প্রাচীরের প্রসারণ ঘটিয়ে উদ্ভিদের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটায়। 

 এই প্রক্রিয়ার মূল ধাপগুলো নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হলো: 

  1.  প্রোটন পাম্পের সক্রিয়করণ (Activation of Proton Pumps):

     অক্সিন (IAA) কোষের প্লাজমা মেমব্রেনে থাকা H+-ATPase (Proton Pump)-কে সক্রিয় করে। এর ফলে কোষের সাইটোপ্লাজম থেকে প্রোটন (H+ আয়ন) কোষ প্রাচীরের (Cell wall) দিকে পাম্প হতে থাকে।

  2. কোষ প্রাচীরের অম্লকরণ (Acidification of the Cell Wall):

     প্রোটন পাম্পের ক্রমাগত কার্যকারিতার ফলে কোষ প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে (Apoplast) H+ আয়নের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। এর ফলে কোষ প্রাচীরের pH কমে যায় (অর্থাৎ পরিবেশটি অম্লীয় বা Acidic হয়, সাধারণত pH 4.5 - 5.0 এর মধ্যে থাকে)। এই কারণেই একে "Acid Growth" বলা হয়। 

  3. এক্সপ্যানসিন প্রোটিনের সক্রিয়তা (Activation of Expansins):

    অম্লীয় পরিবেশে কোষ প্রাচীরে থাকা বিশেষ ধরনের এনজাইম বা প্রোটিন, যাকে Expansin (এক্সপ্যানসিন) বলা হয়, তা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই প্রোটিনগুলো সেলুলোজ মাইক্রোফাইব্রিল এবং হেমিসেলুলোজের মধ্যকার হাইড্রোজেন বন্ধনগুলোকে (Hydrogen bonds) শিথিল বা দুর্বল করে দেয়।

  4. কোষ প্রাচীরের প্রসারণ (Cell Wall Loosening): যখন হাইড্রোজেন বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে যায়, তখন কোষ প্রাচীর নমনীয় বা প্রসারণযোগ্য হয়ে ওঠে। একে বলা হয় "Wall Loosening"।
  5. টারগার প্রেশার ও বৃদ্ধি (Turgor Pressure and Growth):যেহেতু কোষ প্রাচীর এখন নরম, তাই কোষের ভেতরে থাকা টারগার প্রেশার (অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় জল প্রবেশের ফলে সৃষ্ট চাপ) কোষকে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে কোষটি লম্বা হয়ে প্রসারিত হয়।

    Share:

    ইন্ডোল রিং (Indole Ring)

    ইন্ডোল রিং (Indole Ring) হলো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জৈব রাসায়নিক কাঠামো, যা অনেক প্রয়োজনীয় জৈবিক অণুর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এটি একটি বিষমচাক্রিক (Heterocyclic) অ্যারোমেটিক জৈব যৌগ। 

    রাসায়নিক গঠন


    ইন্ডোল রিং মূলত দুটি রিং বা বলয়ের সমন্বয়ে গঠিত: 

    • বেনজিন রিং (Benzene Ring): একটি ছয় কার্বনবিশিষ্ট অ্যারোমেটিক বলয়। 
    • পাইরোল রিং (Pyrrole Ring): একটি পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট বলয়, যাতে একটি নাইট্রোজেন পরমাণু থাকে। এই দুটি বলয় একত্রে ফিউজড (Fused) হয়ে ইন্ডোল রিং গঠন করে। 
    এর রাসায়নিক সংকেত হলো C8H7N। 

     অক্সিন (IAA): উদ্ভিদের প্রধান বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক হরমোন ইন্ডোল-৩-অ্যাসিটিক অ্যাসিডের মূল কাঠামো হলো এই ইন্ডোল বলয়। 

     অ্যামাইনো অ্যাসিড: প্রোটিন তৈরির অন্যতম উপাদান ট্রিপটোফ্যান (Tryptophan) একটি ইন্ডোল বলয় ধারণ করে। 

     সেরোটোনিন (Serotonin): মানুষের মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটার যা মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তাতেও এই গঠনটি বিদ্যমান।

    Share:

    IAA বা Indole-3-Acetic Acid

    IAA বা Indole-3-Acetic Acid হলো উদ্ভিদের সবচেয়ে পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অক্সিন হরমোন। এটি উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং বিকাশের প্রতিটি ধাপ নিয়ন্ত্রণ করে। 

     1. রাসায়নিক প্রকৃতি ও গঠন: 


     IAA রাসায়নিকভাবে একটি ইন্ডোল বলয় এবং একটি অ্যাসিটিক অ্যাসিড পার্শ্ব-শৃঙ্খল (Side chain) নিয়ে গঠিত। আণবিক সংকেত: C10H9NO2। 

     2. উৎপত্তি: 

     উদ্ভিদের যেসব অংশে কোষ বিভাজন দ্রুত ঘটে এবং বৃদ্ধি বেশি হয়, সেখানেই সাধারণত IAA সংশ্লেষিত হয়:

    •  ভ্রূণমুকুলাবরণী (Coleoptile): এটি অক্সিনের অন্যতম প্রধান উৎস। 
    •  কাণ্ড ও মূলের অগ্রভাগ (Apical Meristems): কান্ড এবং মূলের একদম ডগার অংশে থাকা ভাজক কলা থেকে প্রচুর পরিমাণে IAA তৈরি হয়।
    •  কচি পাতা (Young Leaves): ক্রমবর্ধমান কচি পাতায় উচ্চ মাত্রায় অক্সিন পাওয়া যায়। 
    •  বিকাশমান ফল ও বীজ (Developing Fruits and Seeds): পরাগায়ন ও নিষিক্তকরণের পর ডিম্বাশয় এবং বীজে IAA-এর ঘনত্ব বেড়ে যায়, যা ফলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। 
    •  পরাগরেণু (Pollen): পরাগরেণুর মধ্যেও কিছু পরিমাণ IAA থাকে।
    IAAমূলত উদ্ভিদের বর্ধনশীল অংশে (যেমন—কাণ্ডের ডগা, কচি পাতা) ট্রিপটোফ্যান নামক অ্যামাইনো অ্যাসিড থেকে তৈরি হয়। উদ্ভিদের কোষে Tryptophan নামক অ্যামাইনো অ্যাসিডটি কয়েকটি ধাপে পরিবর্তিত হয়ে ইন্ডোল-৩-অ্যাসিটিক অ্যাসিড (IAA) তৈরি করে। যেমন-ইন্ডোল-৩-পাইরুভিক অ্যাসিড (IPA) পথ। এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় দস্তা (Zn) একটি অপরিহার্য মৌল হিসেবে কাজ করে। মাটি থেকে দস্তার অভাব হলে উদ্ভিদে ট্রিপটোফ্যান থেকে অক্সিন তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, যার ফলে গাছ খর্বাকৃতি হয়ে যায় (যেমন: লিটল লিফ রোগ)।

     __________________________________________________________________________________

     3. IAA-এর প্রধান কাজসমূহ: 
    •  কোষের দীর্ঘীকরণ (Cell Elongation): IAA কোষ প্রাচীরকে নমনীয় করে এবং কোষের ভেতরে জল প্রবেশের মাধ্যমে কোষকে লম্বায় বড় হতে সাহায্য করে (অ্যাসিড গ্রোথ হাইপোথিসিস)
    • অগ্ৰস্থ প্রকটতা (Apical Dominance): উদ্ভিদের কাণ্ডের ডগায় অক্সিনের উপস্থিতি পার্শ্বীয় মুকুলের বৃদ্ধি থামিয়ে দেয় এবং উদ্ভিদকে লম্বায় বাড়তে সাহায্য করে। একেই অগ্রস্থ প্রকটতা বলা হয়। ডগা কেটে দিলে পার্শ্বীয় মুকুলগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। 
    • ফটোট্রপিজম (Phototropism),আলোকবর্তী চলন: অক্সিন হরমোন আলোর প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। যখন উদ্ভিদের কাণ্ডের একপাশ থেকে আলো আসে, তখন অক্সিন আলোর দিকে না থেকে অন্ধকারের দিকে বা ছায়ার দিকে সরে যায়। একে অক্সিনের পার্শ্বীয় পরিবহন (Lateral redistribution) বলা হয়। ছায়ার দিকে যেখানে অক্সিন বেশি থাকে, সেখানে এটি কোষ প্রাচীরে প্রোটন পাম্প সক্রিয় করে দেয় (Acid Growth Hypothesis)। এর ফলে কোষ প্রাচীর নমনীয় হয় এবং জল শোষণের মাধ্যমে কোষটি দ্রুত লম্বা হয়ে যায়| যেহেতু ছায়ার দিকের কোষগুলো আলোর দিকের তুলনায় বেশি লম্বা হয়, তাই কাণ্ডটি ধীরে ধীরে আলোর উৎসের দিকে বেঁকে যায়। এই বিশেষ চলনই উদ্ভিদকে সূর্যালোক পেতে সাহায্য করে। যা পুরো উদ্ভিদটিকে আলোর অভিমুখে ঘুরিয়ে দেয়। 
    • জিওট্রপিজম (Geotropism): অভিকর্ষের প্রভাবে উদ্ভিদের মূল বা কাণ্ডের যে চলন ঘটে, তাকে জিওট্রপিজম (Geotropism) বলা হয়। যখন কোনো উদ্ভিদকে অনুভূমিকভাবে (শুয়িয়ে) রাখা হয়, তখন অভিকর্ষের প্রভাবে অক্সিন কাণ্ড বা মূলের নিচের দিকে বেশি জমা হতে শুরু করে। তবে কাণ্ড এবং মূলের ওপর অক্সিনের প্রভাব সম্পূর্ণ বিপরীত: 
      1. কাণ্ডের ক্ষেত্রে (Negative Geotropism): নিচের দিকে অক্সিনের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সেখানকার কোষগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায়।এর ফলে কাণ্ডের নিচের দিক বেশি লম্বা হয় এবং ডগাটি উপরের দিকে বা অভিকর্ষের বিপরীতে বেঁকে যায়। 
      2.  মূলের ক্ষেত্রে (Positive Geotropism): মূল অক্সিনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। মূলের নিচের দিকে অক্সিনের ঘনত্ব বেড়ে গেলে সেখানে কোষের বৃদ্ধি কমে যায় (Inhibition)। উপরের দিকে অক্সিন কম থাকায় সেখানকার কোষগুলো তুলনামূলক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে মূলটি নিচের দিকে বা অভিকর্ষের অনুকূলে বেঁকে যায়। 
    • মূলের সূচনা (Root Initiation): কাণ্ডের তুলনায় মূলের কোষগুলো অক্সিনের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। কাণ্ডে যে পরিমাণ অক্সিন বৃদ্ধি ঘটায়, মূলে সেই একই পরিমাণ অক্সিন বৃদ্ধিতে বাধা (Inhibition) দেয়। অত্যন্ত কম ঘনত্বের অক্সিন মূলের কোষ বিভাজন এবং বৃদ্ধির জন্য আদর্শ। মূলে যদি অক্সিনের ঘনত্ব বেড়ে যায়, তবে এটি কোষে ইথিলিন (Ethylene) নামক গ্যাসীয় হরমোন তৈরিতে উদ্দীপনা দেয়। ইথিলিন মূলের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি থামিয়ে দেয়। তাই মূলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য অক্সিনের ঘনত্ব কম থাকা জরুরি।কম ঘনত্বের IAA কাণ্ডের কাটিং বা কলম থেকে মূল গজাতে সাহায্য করে। 
    •  ফলের বিকাশ: পরাগায়ন ও নিষিক্তকরণের পর ডিম্বাশয়ে IAA-এর পরিমাণ বেড়ে যায়, যা ফল গঠনে সাহায্য করে। বীজহীন ফল (যেমন: লেবু, আঙুর, তরমুজ) উৎপাদনে IAA-এর প্রভাব অপরিসীম, যাকে পার্থেনোকার্পি বলা হয়। 
    • মোচন রোধ (Prevention of Abscission): যখন কোনো পাতা বা ফল বয়স্ক হয়ে যায়, তখন তার বোঁটার গোড়ায় এক বিশেষ ধরনের কোষের স্তর তৈরি হয় যাকে মোচন স্তর (Abscission Layer) বলে। এই স্তরের কোষগুলো নরম হয়ে যায় এবং একসময় অঙ্গটি গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কচি পাতা বা ফলে অক্সিনের (IAA) ঘনত্ব বেশি থাকে। যতক্ষণ এই অঙ্গগুলো থেকে পর্যাপ্ত অক্সিন বোঁটার দিকে প্রবাহিত হয়, ততক্ষণ মোচন স্তর গঠিত হতে পারে না। এই অকালপক্কতা রোধ করতে কৃত্রিম অক্সিন স্প্রে করা হয়, যা মোচন স্তরের এনজাইমগুলোকে (যেমন- সেলুলেজ) নিষ্ক্রিয় রাখে। 
     4. উদ্ভিদদেহে অক্সিন বা IAA (Indole-3-Acetic Acid)-এর পরিবহন পদ্ধতি

     উদ্ভিদদেহে অক্সিন বা IAA (Indole-3-Acetic Acid)-এর পরিবহন পদ্ধতি অত্যন্ত অনন্য, যাকে পোলার ট্রান্সপোর্ট (Polar Transport) বা মেরুসংলগ্ন পরিবহন বলা হয়। এই প্রক্রিয়াটি মূলত একমুখী এবং এটি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ওপর নির্ভর করে না। 
     নিচে এর কার্যপদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো: 
    1.  মেরুসংলগ্ন পরিবহনের প্রকৃতি (Unidirectional Flow) IAA সাধারণত উদ্ভিদের অগ্রভাগ (Apex) থেকে নিচের দিকে অর্থাৎ কাণ্ডের গোড়ার দিকে পরিবাহিত হয়। একে ব্যাসিপেটাল (Basipetal) পরিবহন বলে। মূলের ক্ষেত্রে এটি অগ্রভাগ থেকে উপরের দিকে (Acropetal) পরিবাহিত হতে পারে। এই সুনির্দিষ্ট অভিমুখ উদ্ভিদ অঙ্গের সঠিক বৃদ্ধি ও গঠন নিশ্চিত করে। 
    2.  পরিবহন মাধ্যম অক্সিন মূলত সংবহন কলার (Phloem) মাধ্যমে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, কিন্তু কোষ থেকে কোষে স্বল্প দূরত্বের মেরুসংলগ্ন পরিবহন ঘটে বিশেষ কিছু প্রোটিন বাহকের সাহায্যে। 
    3.  কেমিওসমোটিক মডেল (Chemiosmotic Model) অক্সিন পরিবহনের এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটি মূলত কোষের ভেতরের এবং বাইরের pH পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে: 
      • কোষে প্রবেশ (Influx): কোষ প্রাচীরের অম্লীয় পরিবেশে (pH প্রায় 5.5) IAA প্রোটন গ্রহণ করে আধানহীন (IAAH) অবস্থায় থাকে, যা সহজেই প্লাজমা মেমব্রেন ভেদ করে কোষে ঢুকতে পারে। এছাড়া AUX1 নামক বিশেষ প্রোটিন বাহক একে কোষে ঢুকতে সাহায্য করে। 
      • সাইটোপ্লাজমে অবস্থা: কোষের ভেতরে pH তুলনামূলক বেশি (প্রায় 7.0) হওয়ায় IAAH ভেঙে আয়নে (IAA-) পরিণত হয়। এই আয়নিত অবস্থা মেমব্রেন ভেদ করে নিজে থেকে বের হতে পারে না। 
      • কোষ থেকে নির্গমন (Efflux): কোষের নিচের দিকে থাকা বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন, যাকে PIN Proteins বলা হয়, এই IAA- আয়নকে কোষ থেকে বের করে নিচের কোষের দিকে পাঠিয়ে দেয়। 
      • PIN প্রোটিনের ভূমিকা অক্সিন পরিবহনের অভিমুখ নির্ধারিত হয় PIN প্রোটিন কোষের কোন দিকে অবস্থান করছে তার ওপর। এই প্রোটিনগুলো সাধারণত কোষের নিচের দিকে (Basal side) সাজানো থাকে, যার ফলে অক্সিন সবসময় উপর থেকে নিচে নামে। এই প্রক্রিয়ায় শক্তি (ATP) ব্যয় হয়, তাই এটি একটি সক্রিয় পরিবহন (Active Transport)।

    Share:

    অ্যালিফ্যাটিক অ্যামিনো অ্যাসিড

    অ্যালিফ্যাটিক অ্যামিনো অ্যাসিড (Aliphatic Amino Acids), হলো সেইসব অ্যামিনো অ্যাসিড যাদের পার্শ্ব-শৃঙ্খল (R-group) শুধুমাত্র কার্বন এবং হাইড্রোজেন পরমাণু দিয়ে গঠিত এবং এগুলো খোলা শিকল (straight or branched chain) আকারে থাকে। এদের কাঠামোর মধ্যে কোনো অ্যারোমেটিক রিং (বেনজিন রিং) থাকে না।এই অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো সাধারণত নন-পোলার (Non-polar) এবং হাইড্রোফোবিক (Hydrophobic) বা জল-বিদ্বেষী হয়। অর্থাৎ, এরা পানির সংস্পর্শে থাকতে পছন্দ করে না।

    প্রধান ৫টি অ্যালিফ্যাটিক অ্যামিনো অ্যাসিড নিচে সহজ থেকে জটিল ক্রমানুসারে অ্যালিফ্যাটিক অ্যামিনো অ্যাসিডগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:

    1. গ্লাইসিন (Glycine): এটি সবথেকে সরলতম অ্যামিনো অ্যাসিড। এর পার্শ্ব-শৃঙ্খল হিসেবে শুধুমাত্র একটি হাইড্রোজেন (-H) পরমাণু থাকে।

    2. অ্যালানাইন (Alanine): এর পার্শ্ব-শৃঙ্খলে একটি মিথাইল গ্রুপ (-CH3) থাকে।

    3. ভ্যালিন (Valine): এটি একটি 'ব্রাঞ্চড চেইন' বা শাখাযুক্ত অ্যামিনো অ্যাসিড। এর গঠন অনেকটা 'V' অক্ষরের মতো।

    4. লিওসিন (Leucine): এটিও একটি শাখাযুক্ত শৃঙ্খল যা প্রোটিন তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে।

    5. আইসোলিউসিন (Isoleucine): এটি লিওসিনের একটি আইসোমার এবং পেশির শক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

    অ্যালিফ্যাটিক অ্যামিনো অ্যাসিডের বৈশিষ্ট্যসমূহ:

    1. জল-বিদ্বেষী ধর্ম (Hydrophobicity): যেহেতু এদের পার্শ্ব-শৃঙ্খলে শুধু হাইড্রোকার্বন থাকে, তাই এরা প্রোটিনের ভেতরের দিকে গুচ্ছবদ্ধ হয়ে থাকে যাতে পানির সংস্পর্শ এড়ানো যায়। এটি প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক (3D) গঠন স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।

    2. রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয়: এদের পার্শ্ব-শৃঙ্খলগুলো সাধারণত রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেয় না, কারণ হাইড্রোকার্বন বন্ধনগুলো বেশ শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল।

    3. শাখাযুক্ত শৃঙ্খল (BCAA): ভ্যালিন, লিওসিন এবং আইসোলিউসিনকে একত্রে BCAA (Branched-Chain Amino Acids) বলা হয়, যা খেলোয়াড় বা বডি বিল্ডারদের পেশি গঠনে বিশেষভাবে সাহায্য করে।

    Share:

    Popular Posts

    Total Pageviews