IAA বা Indole-3-Acetic Acid হলো উদ্ভিদের সবচেয়ে পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অক্সিন হরমোন। এটি উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং বিকাশের প্রতিটি ধাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
1. রাসায়নিক প্রকৃতি ও গঠন:
IAA রাসায়নিকভাবে একটি ইন্ডোল বলয় এবং একটি অ্যাসিটিক অ্যাসিড পার্শ্ব-শৃঙ্খল (Side chain) নিয়ে গঠিত। আণবিক সংকেত: C10H9NO2।
2. উৎপত্তি:
উদ্ভিদের যেসব অংশে কোষ বিভাজন দ্রুত ঘটে এবং বৃদ্ধি বেশি হয়, সেখানেই সাধারণত IAA সংশ্লেষিত হয়:
- ভ্রূণমুকুলাবরণী (Coleoptile): এটি অক্সিনের অন্যতম প্রধান উৎস।
- কাণ্ড ও মূলের অগ্রভাগ (Apical Meristems): কান্ড এবং মূলের একদম ডগার অংশে থাকা ভাজক কলা থেকে প্রচুর পরিমাণে IAA তৈরি হয়।
- কচি পাতা (Young Leaves): ক্রমবর্ধমান কচি পাতায় উচ্চ মাত্রায় অক্সিন পাওয়া যায়।
- বিকাশমান ফল ও বীজ (Developing Fruits and Seeds): পরাগায়ন ও নিষিক্তকরণের পর ডিম্বাশয় এবং বীজে IAA-এর ঘনত্ব বেড়ে যায়, যা ফলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
- পরাগরেণু (Pollen): পরাগরেণুর মধ্যেও কিছু পরিমাণ IAA থাকে।
______________________________________________________
- কোষের দীর্ঘীকরণ (Cell Elongation): IAA কোষ প্রাচীরকে নমনীয় করে এবং কোষের ভেতরে জল প্রবেশের মাধ্যমে কোষকে লম্বায় বড় হতে সাহায্য করে (অ্যাসিড গ্রোথ হাইপোথিসিস)।
- অগ্ৰস্থ প্রকটতা (Apical Dominance): উদ্ভিদের কাণ্ডের ডগায় অক্সিনের উপস্থিতি পার্শ্বীয় মুকুলের বৃদ্ধি থামিয়ে দেয় এবং উদ্ভিদকে লম্বায় বাড়তে সাহায্য করে। একেই অগ্রস্থ প্রকটতা বলা হয়। ডগা কেটে দিলে পার্শ্বীয় মুকুলগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়।
- ফটোট্রপিজম (Phototropism),আলোকবর্তী চলন: অক্সিন হরমোন আলোর প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। যখন উদ্ভিদের কাণ্ডের একপাশ থেকে আলো আসে, তখন অক্সিন আলোর দিকে না থেকে অন্ধকারের দিকে বা ছায়ার দিকে সরে যায়। একে অক্সিনের পার্শ্বীয় পরিবহন (Lateral redistribution) বলা হয়। ছায়ার দিকে যেখানে অক্সিন বেশি থাকে, সেখানে এটি কোষ প্রাচীরে প্রোটন পাম্প সক্রিয় করে দেয় (Acid Growth Hypothesis)। এর ফলে কোষ প্রাচীর নমনীয় হয় এবং জল শোষণের মাধ্যমে কোষটি দ্রুত লম্বা হয়ে যায়| যেহেতু ছায়ার দিকের কোষগুলো আলোর দিকের তুলনায় বেশি লম্বা হয়, তাই কাণ্ডটি ধীরে ধীরে আলোর উৎসের দিকে বেঁকে যায়। এই বিশেষ চলনই উদ্ভিদকে সূর্যালোক পেতে সাহায্য করে। যা পুরো উদ্ভিদটিকে আলোর অভিমুখে ঘুরিয়ে দেয়।
- জিওট্রপিজম (Geotropism): অভিকর্ষের প্রভাবে উদ্ভিদের মূল বা কাণ্ডের যে চলন ঘটে, তাকে জিওট্রপিজম (Geotropism) বলা হয়। যখন কোনো উদ্ভিদকে অনুভূমিকভাবে (শুয়িয়ে) রাখা হয়, তখন অভিকর্ষের প্রভাবে অক্সিন কাণ্ড বা মূলের নিচের দিকে বেশি জমা হতে শুরু করে। তবে কাণ্ড এবং মূলের ওপর অক্সিনের প্রভাব সম্পূর্ণ বিপরীত:
- কাণ্ডের ক্ষেত্রে (Negative Geotropism): নিচের দিকে অক্সিনের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সেখানকার কোষগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায়।এর ফলে কাণ্ডের নিচের দিক বেশি লম্বা হয় এবং ডগাটি উপরের দিকে বা অভিকর্ষের বিপরীতে বেঁকে যায়।
- মূলের ক্ষেত্রে (Positive Geotropism): মূল অক্সিনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। মূলের নিচের দিকে অক্সিনের ঘনত্ব বেড়ে গেলে সেখানে কোষের বৃদ্ধি কমে যায় (Inhibition)। উপরের দিকে অক্সিন কম থাকায় সেখানকার কোষগুলো তুলনামূলক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে মূলটি নিচের দিকে বা অভিকর্ষের অনুকূলে বেঁকে যায়।
- মূলের সূচনা (Root Initiation): কাণ্ডের তুলনায় মূলের কোষগুলো অক্সিনের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। কাণ্ডে যে পরিমাণ অক্সিন বৃদ্ধি ঘটায়, মূলে সেই একই পরিমাণ অক্সিন বৃদ্ধিতে বাধা (Inhibition) দেয়। অত্যন্ত কম ঘনত্বের অক্সিন মূলের কোষ বিভাজন এবং বৃদ্ধির জন্য আদর্শ। মূলে যদি অক্সিনের ঘনত্ব বেড়ে যায়, তবে এটি কোষে ইথিলিন (Ethylene) নামক গ্যাসীয় হরমোন তৈরিতে উদ্দীপনা দেয়। ইথিলিন মূলের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি থামিয়ে দেয়। তাই মূলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য অক্সিনের ঘনত্ব কম থাকা জরুরি।কম ঘনত্বের IAA কাণ্ডের কাটিং বা কলম থেকে মূল গজাতে সাহায্য করে।
- ফলের বিকাশ: পরাগায়ন ও নিষিক্তকরণের পর ডিম্বাশয়ে IAA-এর পরিমাণ বেড়ে যায়, যা ফল গঠনে সাহায্য করে। বীজহীন ফল (যেমন: লেবু, আঙুর, তরমুজ) উৎপাদনে IAA-এর প্রভাব অপরিসীম, যাকে পার্থেনোকার্পি বলা হয়।
- মোচন রোধ (Prevention of Abscission): যখন কোনো পাতা বা ফল বয়স্ক হয়ে যায়, তখন তার বোঁটার গোড়ায় এক বিশেষ ধরনের কোষের স্তর তৈরি হয় যাকে মোচন স্তর (Abscission Layer) বলে। এই স্তরের কোষগুলো নরম হয়ে যায় এবং একসময় অঙ্গটি গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কচি পাতা বা ফলে অক্সিনের (IAA) ঘনত্ব বেশি থাকে। যতক্ষণ এই অঙ্গগুলো থেকে পর্যাপ্ত অক্সিন বোঁটার দিকে প্রবাহিত হয়, ততক্ষণ মোচন স্তর গঠিত হতে পারে না। এই অকালপক্কতা রোধ করতে কৃত্রিম অক্সিন স্প্রে করা হয়, যা মোচন স্তরের এনজাইমগুলোকে (যেমন- সেলুলেজ) নিষ্ক্রিয় রাখে।
- মেরুসংলগ্ন পরিবহনের প্রকৃতি (Unidirectional Flow) IAA সাধারণত উদ্ভিদের অগ্রভাগ (Apex) থেকে নিচের দিকে অর্থাৎ কাণ্ডের গোড়ার দিকে পরিবাহিত হয়। একে ব্যাসিপেটাল (Basipetal) পরিবহন বলে। মূলের ক্ষেত্রে এটি অগ্রভাগ থেকে উপরের দিকে (Acropetal) পরিবাহিত হতে পারে। এই সুনির্দিষ্ট অভিমুখ উদ্ভিদ অঙ্গের সঠিক বৃদ্ধি ও গঠন নিশ্চিত করে।
- পরিবহন মাধ্যম অক্সিন মূলত সংবহন কলার (Phloem) মাধ্যমে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, কিন্তু কোষ থেকে কোষে স্বল্প দূরত্বের মেরুসংলগ্ন পরিবহন ঘটে বিশেষ কিছু প্রোটিন বাহকের সাহায্যে।
- কেমিওসমোটিক মডেল (Chemiosmotic Model) অক্সিন পরিবহনের এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটি মূলত কোষের ভেতরের এবং বাইরের pH পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে:
- কোষে প্রবেশ (Influx): কোষ প্রাচীরের অম্লীয় পরিবেশে (pH প্রায় 5.5) IAA প্রোটন গ্রহণ করে আধানহীন (IAAH) অবস্থায় থাকে, যা সহজেই প্লাজমা মেমব্রেন ভেদ করে কোষে ঢুকতে পারে। এছাড়া AUX1 নামক বিশেষ প্রোটিন বাহক একে কোষে ঢুকতে সাহায্য করে।
- সাইটোপ্লাজমে অবস্থা: কোষের ভেতরে pH তুলনামূলক বেশি (প্রায় 7.0) হওয়ায় IAAH ভেঙে আয়নে (IAA-) পরিণত হয়। এই আয়নিত অবস্থা মেমব্রেন ভেদ করে নিজে থেকে বের হতে পারে না।
- কোষ থেকে নির্গমন (Efflux): কোষের নিচের দিকে থাকা বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন, যাকে PIN Proteins বলা হয়, এই IAA- আয়নকে কোষ থেকে বের করে নিচের কোষের দিকে পাঠিয়ে দেয়।
- PIN প্রোটিনের ভূমিকা অক্সিন পরিবহনের অভিমুখ নির্ধারিত হয় PIN প্রোটিন কোষের কোন দিকে অবস্থান করছে তার ওপর। এই প্রোটিনগুলো সাধারণত কোষের নিচের দিকে (Basal side) সাজানো থাকে, যার ফলে অক্সিন সবসময় উপর থেকে নিচে নামে। এই প্রক্রিয়ায় শক্তি (ATP) ব্যয় হয়, তাই এটি একটি সক্রিয় পরিবহন (Active Transport)।
